বিংশ শতাব্দীর ইসলামী ইতিহাসে যে কয়জন ক্ষণজন্মা মনীষী রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর সুন্নাহর সুরক্ষায় এবং হাদিস শাস্ত্রের পুনর্জাগরণে নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছেন, তাঁদের মধ্যে শাইখ মুহাম্মাদ নাসিরুদ্দীন আল-আলবানী (রহ.)-এর নাম সর্বাগ্রে স্মরণীয়। শত শত বছর ধরে মুসলিম সমাজে প্রচলিত থাকা জাল ও দুর্বল হাদিসের জঞ্জাল সরিয়ে বিশুদ্ধ ইসলামী জ্ঞানভাণ্ডারকে তিনি নতুন রূপ দান করেছেন।
## জন্ম, বংশপরিচয় ও হিজরত
শাইখ আল-আলবানী (রহ.) ১৯১৪ খ্রিস্টাব্দে (১৩৩৩ হিজরি) ইউরোপের আলবেনিয়ার তৎকালীন রাজধানী স্কোডারে (Ashkodera) এক দরিদ্র কিন্তু অত্যন্ত ধার্মিক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা শাইখ নূহ নাজাতী ছিলেন আলবেনিয়ার একজন শীর্ষস্থানীয় হানাফী আলেম। শাইখের বাল্যকালেই আলবেনিয়ায় রাজা আহমাদ জোগু (King Zog)-এর ধর্মনিরপেক্ষ ও পাশ্চাত্যপন্থী শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। মহিলাদের হিজাব নিষিদ্ধ করা এবং পশ্চিমা পোশাক পরিধান বাধ্যতামূলক করার মতো ইসলামবিরোধী আইন প্রণীত হলে, তাঁর পিতা দ্বীন রক্ষার তাগিদে সপরিবারে সিরিয়ার দামেস্কে হিজরত করার সিদ্ধান্ত নেন। সিরিয়া তখন ইসলামী জ্ঞান-বিজ্ঞানের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র ছিল, যা ছোট্ট নাসিরুদ্দীনের জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।
## প্রাথমিক শিক্ষা ও জীবিকা
দামেস্কে পৌঁছানোর পর তিনি তাঁর পিতার কাছেই আরবি ভাষা, কুরআন মাজীদ, তাজবীদ এবং হানাফী ফিকহ অধ্যয়ন শুরু করেন। পাশাপাশি দামেস্কের স্থানীয় মাদরাসায়ও তিনি পড়ালেখা করেন। তবে প্রথাগত প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার চেয়ে তাঁর পিতার ব্যক্তিগত তত্ত্বাবধানই তাঁকে বেশি ঋদ্ধ করেছিল।
জীবিকা নির্বাহের জন্য তাঁর পিতা তাঁকে ঘড়ি মেরামতের পেশায় নিযুক্ত করেন। এই সূক্ষ্ম ও ধৈর্যের পেশা শাইখ আল-আলবানী (রহ.)-এর জীবনে সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলেছিল। ঘড়ি মেরামতের কাজ তাঁকে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করে তোলে এবং দ্বীনি ইলমকে জীবিকার হাতিয়ার বানানো থেকে রক্ষা করে। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, এই কাজের সুবাদে তিনি প্রতিদিন একটি নির্দিষ্ট সময় কাজ করে বাকিটা সময় পড়াশোনা ও গবেষণায় ব্যয় করার অবারিত সুযোগ পান। ঘড়ির সূক্ষ্ম যন্ত্রপাতির সাথে কাজ করার যে অসীম ধৈর্য তাঁর তৈরি হয়েছিল, পরবর্তীতে হাদিসের বর্ণনাকারীদের (রাবী) সূক্ষ্ম ত্রুটি-বিচ্যুতি নির্ণয়ে তা দারুণ কাজে এসেছিল।
## হাদিস শাস্ত্রের প্রতি অনুরাগ ও আয-যাহিরিয়্যা লাইব্রেরি
যৌবনের প্রারম্ভে শাইখ আল-আলবানী (রহ.) মিসরের বিখ্যাত ইসলামী চিন্তাবিদ আল্লামা রশিদ রিদা (রহ.) সম্পাদিত ‘আল-মানার’ পত্রিকার একটি প্রবন্ধ পড়েন। প্রবন্ধটি ছিল ইমাম গাজ্জালী (রহ.)-এর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘ইহয়াউ উলুমুদ্দীন’-এ উল্লেখিত হাদিসগুলোর সত্যতা যাচাইয়ের ওপর। এই প্রবন্ধটি তাঁর মনে গভীর রেখাপাত করে এবং ইলমুল হাদিস বা হাদিস বিজ্ঞানের প্রতি তাঁকে প্রচণ্ডভাবে আকৃষ্ট করে।
এরপর থেকে তিনি দামেস্কের বিখ্যাত ‘আয-যাহিরিয়্যা’ লাইব্রেরিতে নিয়মিত যাওয়া শুরু করেন। এটি ছিল তৎকালীন ইসলামী বিশ্বের অন্যতম সমৃদ্ধ একটি পাঠাগার, যেখানে হাজার হাজার দুষ্প্রাপ্য পাণ্ডুলিপি সংরক্ষিত ছিল। শাইখ আল-আলবানী (রহ.) প্রতিদিন প্রায় ১২ ঘণ্টারও বেশি সময় এই লাইব্রেরিতে বসে প্রাচীন পাণ্ডুলিপিগুলো অধ্যয়ন করতেন। তাঁর এই অদম্য স্পৃহা ও অধ্যবসায় দেখে লাইব্রেরির তৎকালীন পরিচালক তাঁকে লাইব্রেরির একটি বিশেষ চাবি এবং আলাদা একটি কক্ষ বরাদ্দ দেন, যাতে তিনি লাইব্রেরি বন্ধ হওয়ার পরও নিরিবিলি পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারেন। লাইব্রেরির উঁচু তাকগুলো থেকে পাণ্ডুলিপি নামাতে গিয়ে অনেক সময় তিনি মইয়ের ওপর বসেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা পড়াশোনা চালিয়ে যেতেন। কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি বা নির্দিষ্ট উস্তাদ ছাড়াই, শুধুমাত্র নিরলস অধ্যবসায় এবং পূর্বসূরি ইমামদের কিতাবের সাহায্যে তিনি নিজেকে একজন শীর্ষস্থানীয় মুহাদ্দিস হিসেবে গড়ে তোলেন।
## ইলমী মানহাজ (গবেষণা পদ্ধতি) ও চিন্তাধারা
শাইখ আল-আলবানী (রহ.)-এর সংস্কার কাজের মূলভিত্তি ছিল দুটি—’তাসফিয়াহ’ (বিশুদ্ধকরণ) এবং ‘তারবিয়াহ’ (প্রশিক্ষণ)।
১. তাসফিয়াহ: মুসলিমদের আকিদা, ইবাদত এবং সমাজজীবন থেকে জাল, দুর্বল ও ভিত্তিহীন বর্ণনাগুলোকে পৃথক করা। তিনি বিশ্বাস করতেন, উম্মাহর অধঃপতনের অন্যতম কারণ হলো দ্বীনের নামে জাল ও দুর্বল হাদিসের ওপর আমল করা।
২. তারবিয়াহ: বিশুদ্ধ সুন্নাহর ভিত্তিতে মুসলিম তরুণ সমাজকে নতুনভাবে গড়ে তোলা।
তিনি নির্দিষ্ট কোনো মাযহাবের অন্ধ অনুকরণের (তাকলীদ) ঘোর বিরোধী ছিলেন। তাঁর মতে, কোনো ফিকহী মাসআলায় যদি সরাসরি সহীহ হাদিস পাওয়া যায়, তবে কোনো ইমাম বা আলিমের নিজস্ব মতামতের চেয়ে সেই হাদিসকেই নিঃশর্তভাবে অগ্রাধিকার দিতে হবে। এই চিন্তাধারার কারণে তাঁকে সেসময়কার অনেক গতানুগতিক আলেমের বিরোধিতার সম্মুখীন হতে হয়েছিল। এমনকি তাঁর নিজের পিতাও প্রথমদিকে তাঁর এই দৃষ্টিভঙ্গির তীব্র সমালোচনা করেছিলেন। কিন্তু সত্যের প্রতি অবিচল শাইখ আল-আলবানী (রহ.) কোনো বাধাতেই পিছপা হননি।
## শিক্ষকতা ও দাওয়াহ কার্যক্রম
১৯৬১ সালে যখন মদিনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়, তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন চ্যান্সেলর শাইখ আব্দুল আযীয ইবনে বায (রহ.) তাঁকে সেখানে হাদিস শাস্ত্রের অধ্যাপক হিসেবে আমন্ত্রণ জানান। ১৯৬১ থেকে ১৯৬৩ সাল পর্যন্ত তিনি সেখানে অত্যন্ত সুনামের সাথে শিক্ষকতা করেন। তাঁর পাঠদান পদ্ধতি এতই আকর্ষণীয় এবং গবেষণাধর্মী ছিল যে, পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা ছাত্ররা তাঁর দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত হয়।
পরবর্তীতে তিনি সিরিয়া, জর্দান, কাতার, কুয়েত, মিশরসহ বিভিন্ন দেশে সফর করেন এবং অসংখ্য সেমিনার, দরস ও উন্মুক্ত প্রশ্নোত্তর পর্বে অংশ নেন। তাঁর এই দাওয়াহ কার্যক্রমের মাধ্যমে পুরো আরব বিশ্বে সুন্নাহ ভিত্তিক জীবনযাপনের এক নতুন জোয়ার তৈরি হয়।
## অবিস্মরণীয় সাহিত্যিক ও গবেষণামূলক অবদান
শাইখ আল-আলবানী (রহ.)-এর সবচেয়ে বড় অবদান হলো তাঁর লিখিত ও তাহকীককৃত অমূল্য গ্রন্থাবলি। তিনি প্রায় তিন শতাধিক গ্রন্থের রচনা, তাহকীক (যাচাই-বাছাই) ও সম্পাদনা করেছেন। তাঁর কয়েকটি মাস্টারপিস বা যুগান্তকারী রচনার মধ্যে রয়েছে:
- সিলসিলাতুল আহাদিস আস-সাহিহাহ: এটি তাঁর জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কাজ। এই বিশাল সংকলনে তিনি ইসলামী ইতিহাসের বিভিন্ন গ্রন্থে ছড়িয়ে থাকা সহীহ হাদিসগুলোকে অত্যন্ত নিখুঁত সনদের পর্যালোচনাসহ একত্রিত করেছেন।
- সিলসিলাতুল আহাদিস আয-যায়িফাহ ওয়াল মাওজুআহ: এই গ্রন্থে তিনি সমাজে প্রচলিত দুর্বল ও বানোয়াট হাদিসগুলোকে একত্রিত করেছেন এবং সেগুলোর সনদ কেন দুর্বল, তা প্রামাণ্য দলিলের ভিত্তিতে প্রমাণ করেছেন। এর ফলে অসংখ্য ভিত্তিহীন আমল থেকে মুসলিম সমাজ সচেতন হওয়ার সুযোগ পায়।
- ইরওয়াউল গালিল ফী তাখরিজী আহাদিসি মানারিস সাবিল: হাম্বলী ফিকহের অত্যন্ত জনপ্রিয় গ্রন্থ ‘মানারুস সাবিল’-এ উল্লেখিত প্রতিটি হাদিসের বিস্তারিত সনদগত বিশ্লেষণ করেছেন এই গ্রন্থে। ফিকহ ও হাদিসের সমন্বয়ে এটি একটি অনবদ্য সৃষ্টি।
- সিফাতু সালাতিন নাবী (সা.): এটি একটি কালজয়ী গ্রন্থ। তাকবিরে তাহরিমা থেকে শুরু করে সালাম ফেরানো পর্যন্ত রাসূলুল্লাহ (সা.) কীভাবে সালাত আদায় করতেন, তা কেবল সহীহ হাদিসের আলোকে এই বইয়ে তুলে ধরা হয়েছে। এটি বিশ্বের বহু ভাষায় অনূদিত হয়ে কোটি কোটি মানুষের সালাত সংশোধনে ভূমিকা রেখেছে।
- সুনান গ্রন্থসমূহের তাহকীক: আবু দাউদ, তিরমিযী, নাসায়ী এবং ইবনে মাজাহ—এই চার সুনান গ্রন্থের হাদিসগুলোকে তিনি সহীহ ও যঈফ (দুর্বল) এই দুই ক্যাটাগরিতে বিভক্ত করেছেন। যেমন: ‘সহীহ আবু দাউদ’ এবং ‘যঈফ আবু দাউদ’। আধুনিক যুগের স্কলারদের জন্য এটি গবেষণার পথকে অত্যন্ত সুগম করেছে।
## কারাবরণ, হিজরত ও জীবনের শেষ দিনগুলো
তাঁর স্পষ্টবাদিতা এবং প্রচলিত ভ্রান্ত ধারণার বিরুদ্ধে আপোষহীন অবস্থানের কারণে তাঁকে জীবনে বহুবার রাজনৈতিক ও সামাজিক নিপীড়নের শিকার হতে হয়। ১৯৬৭ সালে সিরিয়া সরকার তাঁকে প্রথমবার জেলে বন্দী করে। এরপর ১৯৭৯ সালেও তাঁকে পুনরায় কারাবরণ করতে হয়। কারাগারে থাকা অবস্থাতেও তিনি তাঁর লেখনী বন্ধ করেননি; বরং জেলের ভেতরে বসে একটি ছেঁড়া কাগজের টুকরো এবং পেন্সিল দিয়ে সহীহ মুসলিমের একটি গুরুত্বপূর্ণ পাণ্ডুলিপির তাহকীক সম্পন্ন করেছিলেন।
সিরিয়ার রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা এবং তাঁর ওপর চলমান নজরদারির কারণে তিনি পরবর্তীতে জর্দানের রাজধানী আম্মানে চিরতরে হিজরত করেন। জীবনের শেষ দিনগুলোতে তিনি নানাবিধ শারীরিক অসুস্থতায় ভুগতেন। তবে অসুস্থ অবস্থাতেও তিনি বিছানায় শুয়ে শুয়ে হাদিসের পাণ্ডুলিপি অধ্যয়ন করতেন এবং ছাত্রদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দিতেন।
ইসলামী জ্ঞান-বিজ্ঞানে তাঁর এই অবিস্মরণীয় অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৯৯ সালে তাঁকে সৌদি আরবের সর্বোচ্চ সম্মানজনক পুরষ্কার ‘কিং ফয়সাল ইন্টারন্যাশনাল প্রাইজ’ প্রদান করা হয়।
## ইন্তেকাল
ইলমুল হাদিসের এই অতন্দ্র প্রহরী ১৯৯৯ সালের ২ অক্টোবর (২২ জুমাদাল উখরা, ১৪২০ হিজরি) জর্দানের আম্মানে ইন্তেকাল করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৫ বছর। তাঁর জানাযায় লাখ লাখ মানুষের ঢল নেমেছিল।
শাইখ আল-আলবানী (রহ.) আজ পৃথিবীতে নেই, কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া সাহিত্যিক ও গবেষণামূলক বিশাল উত্তরাধিকার কিয়ামত পর্যন্ত মুসলিম উম্মাহকে সুন্নাহর সঠিক পথ দেখাতে সাহায্য করবে। তাঁর জীবন আমাদের শেখায় যে, পাহাড়সম বাধা থাকলেও কেবল একনিষ্ঠতা এবং নিরলস পরিশ্রমের মাধ্যমে দ্বীনের কত বড় খেদমত আনজাম দেওয়া সম্ভব।
(আপনার পরবর্তী নির্দেশনার ভিত্তিতে শাইখ ইবনে বায (রহ.)-এর জীবনী আলাদা মেসেজে প্রদান করা হবে ইনশাআল্লাহ।)