ইসলামের সুদীর্ঘ ইতিহাসে যুগে যুগে মহান আল্লাহ এমন কিছু প্রজ্ঞাবান ও মুখলিস (একনিষ্ঠ) আলেমের জন্ম দিয়েছেন, যাঁরা কেবল তাঁদের গভীর জ্ঞানের জন্যই নয়, বরং তাঁদের তাকওয়া (খোদাভীতি), বিনয় এবং মুসলিম উম্মাহর প্রতি অপরিসীম দরদের কারণে মানুষের হৃদয়ে স্থায়ী আসন করে নিয়েছেন। বিংশ শতাব্দীর এমন একজন অবিসংবাদিত ব্যক্তিত্ব হলেন শাইখ আব্দুল আযীয ইবনে বায (রহ.)। তিনি ছিলেন একাধারে একজন প্রাজ্ঞ বিচারক, দূরদর্শী শিক্ষাবিদ, আন্তর্জাতিক ইসলামী ব্যক্তিত্ব এবং সমকালীন বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফতোয়া প্রদানকারী (মুফতি)।
## জন্ম, বংশপরিচয় ও প্রাথমিক জীবন
শাইখ আব্দুল আযীয ইবনে বায (রহ.) ১৯১০ খ্রিস্টাব্দে (১২ জিলহজ, ১৩৩০ হিজরি) সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পরিবার ‘আলে বায’ নামে পরিচিত ছিল, যা মূলত কৃষিকাজ এবং ব্যবসার সাথে জড়িত থাকলেও এই বংশে বেশ কয়েকজন খ্যাতিমান আলেমের জন্ম হয়েছিল। শাইখ ইবনে বায (রহ.) মাত্র তিন বছর বয়সে পিতৃহীন হন। এরপর তাঁর দ্বীনদার মায়ের একনিষ্ঠ তত্ত্বাবধানে তিনি বেড়ে ওঠেন। তাঁর মা তাঁকে ছোটবেলা থেকেই ইলম অর্জনের প্রতি গভীরভাবে উৎসাহিত করতেন। অত্যন্ত প্রখর মেধার অধিকারী এই বালক কৈশোরে পদার্পণ করার আগেই সম্পূর্ণ কুরআন মাজীদ হিফজ (মুখস্থ) সম্পন্ন করেন।
## দৃষ্টিশক্তি হারানো ও অদম্য ইচ্ছাশক্তি
শাইখ ইবনে বায (রহ.)-এর জীবনের অন্যতম বড় একটি পরীক্ষা ছিল তাঁর দৃষ্টিশক্তি হারানো। ১৬ বছর বয়সে তাঁর চোখে একটি মারাত্মক সংক্রমণ (ইনফেকশন) দেখা দেয়। ফলে তাঁর চোখের দৃষ্টি ক্ষীণ হতে শুরু করে। চিকিৎসা করেও কোনো সুফল পাওয়া যায়নি এবং ১৯২৭ খ্রিস্টাব্দে (১৩৪৬ হিজরি), যখন তাঁর বয়স মাত্র ২০ বছর, তখন তিনি তাঁর দুই চোখের দৃষ্টিশক্তি চিরতরে হারিয়ে ফেলেন।
কিন্তু শারীরিক এই বিশাল প্রতিবন্ধকতা তাঁর জ্ঞানান্বেষণের পথে বিন্দুমাত্র বাধা হতে পারেনি। বরং বাইরের দৃষ্টি হারিয়ে তিনি অন্তরের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি (বসিরাত) লাভ করেছিলেন। দৃষ্টিশক্তি হারানোর পর তাঁর একাগ্রতা ও স্মরণশক্তি এতটাই বৃদ্ধি পেয়েছিল যে, একবার কোনো হাদিস বা মাসআলা শুনলে তা তাঁর মগজে গেঁথে যেত। এই অন্ধত্বের ব্যাপারে তিনি কখনোই আক্ষেপ করতেন না; বরং বলতেন, “আল্লাহ আমার দুটি চোখ নিয়ে নিয়েছেন ঠিকই, কিন্তু এর বিনিময়ে তিনি আমাকে দ্বীনের বুঝ এবং প্রখর স্মরণশক্তি দান করেছেন। আমি আশা করি আখেরাতে এর বিনিময়ে আমি জান্নাত লাভ করব।”
## শিক্ষাজীবন ও প্রখ্যাত উস্তাদগণ
কুরআন মুখস্থ করার পর তিনি তাঁর যুগের রিয়াদের শ্রেষ্ঠ আলেমদের কাছে ইসলামী বিভিন্ন শাখার জ্ঞান অর্জন শুরু করেন। তিনি আরবি ভাষা, ব্যাকরণ, তাফসির, হাদিস, ফিকহ এবং আকিদার ওপর গভীর জ্ঞান লাভ করেন।
তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় উস্তাদ ছিলেন তৎকালীন সৌদি আরবের গ্র্যান্ড মুফতি শাইখ মুহাম্মাদ ইবনে ইবরাহিম আল আশ-শাইখ (রহ.)। শাইখ ইবনে বায তাঁর কাছে টানা দশ বছর (১৯২৭ থেকে ১৯৩৭ সাল পর্যন্ত) ছায়ার মতো লেগে থেকে ইলম অর্জন করেন। এছাড়া তিনি শাইখ সা’দ ইবনে হামাদ ইবনে আতিক, শাইখ সালিহ ইবনে আব্দুল আযীয এবং মক্কার প্রখ্যাত আলেমদের কাছেও শিক্ষা লাভ করেন। তাঁর মেধা ও প্রজ্ঞায় মুগ্ধ হয়ে তাঁর উস্তাদগণ তাঁকে অল্প বয়সেই ফতোয়া প্রদান ও শিক্ষকতা করার অনুমতি প্রদান করেন।
## সুদীর্ঘ ও বৈচিত্র্যময় কর্মজীবন
শাইখ ইবনে বায (রহ.)-এর কর্মজীবন ছিল অত্যন্ত বিস্তৃত এবং উম্মাহর খেদমতে নিবেদিত। তাঁর কর্মজীবনকে কয়েকটি প্রধান ভাগে ভাগ করা যায়:
১. বিচারক হিসেবে (কাজী): ১৯৩৮ সালে (১৩৫৭ হিজরি) তাঁর উস্তাদ শাইখ মুহাম্মাদ ইবনে ইবরাহিমের সুপারিশে তাঁকে রিয়াদ সংলগ্ন ‘আল-খারজ’ অঞ্চলের প্রধান বিচারক নিয়োগ করা হয়। সেখানে তিনি দীর্ঘ ১৪ বছর অত্যন্ত ন্যায়নিষ্ঠার সাথে বিচারকার্য পরিচালনা করেন। শুধু বিচারকই নন, সেখানে তিনি একজন সফল দাঈ এবং শিক্ষক হিসেবেও ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করেন।
২. শিক্ষকতা ও রিয়াদ বিশ্ববিদ্যালয়: ১৯৫২ সালে তিনি রিয়াদের ‘সায়েন্টিফিক ইন্সটিটিউট’ এবং পরবর্তীতে রিয়াদ শরিয়া অনুষদে শিক্ষকতা শুরু করেন। এখানে তিনি প্রায় ৯ বছর তাফসির, ফিকহ এবং তাওহীদের ওপর পাঠদান করেন।
৩. মদিনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্বভার: ১৯৬১ সালে যখন মদিনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়, তখন তাঁকে এর ভাইস-চ্যান্সেলর (উপাচার্য) নিয়োগ করা হয়। পরবর্তীতে ১৯৭০ সালে তিনি এই বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলর হিসেবে পদোন্নতি পান। তাঁর সুদক্ষ পরিচালনায় এই বিশ্ববিদ্যালয়টি সারা বিশ্বের মুসলিম ছাত্রদের জন্য ইসলামী জ্ঞান অর্জনের এক বিশাল আন্তর্জাতিক কেন্দ্রে পরিণত হয়।
৪. ফতোয়া বোর্ড ও গ্র্যান্ড মুফতি: ১৯৭৫ সালে তাঁকে সৌদি আরবের ‘প্রেসিডেন্সি অব স্কলারলি রিসার্চ অ্যান্ড ইফতা’ (গবেষণা ও ফতোয়া বিষয়ক সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় বোর্ড)-এর প্রধান করা হয়। পরবর্তীতে ১৯৯৩ সালে তিনি সৌদি আরবের সর্বোচ্চ ধর্মীয় পদ ‘গ্র্যান্ড মুফতি’ এবং ‘কাউন্সিল অব সিনিয়র স্কলার্স’-এর সভাপতি হিসেবে নিযুক্ত হন এবং আমৃত্যু অত্যন্ত সফলতার সাথে এই দায়িত্ব পালন করেন।
## ইলমী পদ্ধতি ও ফতোয়া প্রদানের মানদণ্ড
ফিকহী মাসআলার ক্ষেত্রে তিনি মূলত হাম্বলী মাজহাবের অনুসারী ছিলেন। তবে শাইখ আল-আলবানী (রহ.)-এর মতোই তিনি অন্ধ অনুকরণের (তাকলীদ) ঘোর বিরোধী ছিলেন। তাঁর ফতোয়া প্রদানের মূল মানদণ্ড ছিল সরাসরি পবিত্র কুরআন এবং সহীহ সুন্নাহ। যখনই কোনো বিষয়ে তিনি সহীহ হাদিসের সন্ধান পেতেন, তখন মাজহাবের মতের বাইরে গিয়েও তিনি নির্ভীকভাবে হাদিসের ওপর আমল করার ফতোয়া দিতেন। জটিল এবং আধুনিক যুগের নিত্যনতুন সমস্যা সমাধানে তাঁর ইজতিহাদ (গবেষণা) এবং ফতোয়াগুলো সমকালীন ইসলামী বিশ্বে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য বলে বিবেচিত হতো।
## চারিত্রিক মাধুর্য, বিনয় ও দানশীলতা
শাইখ ইবনে বায (রহ.)-এর চরিত্র ছিল সালফে সালেহীনের (পূর্বসূরি নেককারদের) জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। তাঁর বিনয় ও অমায়িক ব্যবহার যে কাউকেই মুগ্ধ করত। তিনি এত বড় একজন রাষ্ট্রীয় পদে থেকেও অত্যন্ত সাদাসিধা জীবনযাপন করতেন।
তাঁর দানশীলতা ও মেহমানদারির খ্যাতি ছিল কিংবদন্তিতুল্য। তাঁর বাড়িটি যেন ছিল একটি উন্মুক্ত মেহমানখানা। প্রতিদিন তাঁর দস্তরখানে শত শত মানুষ (ছাত্র, মুসাফির, অভাবী এবং সাধারণ মানুষ) একত্রে বসে খাবার খেতেন। তিনি নিজে অন্ধ হওয়া সত্ত্বেও খাবার সময় মেহমানদের খোঁজ নিতেন। বিশ্বের যেকোনো প্রান্ত থেকে যে কেউ তাঁকে ফোন করে ফতোয়া জিজ্ঞেস করতে পারত। তাঁর টেলিফোন লাইন সবসময় সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত থাকত। অনেক সময় তিনি গভীর রাতেও মানুষের ফতোয়ার উত্তর দিতেন এবং তাদের সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করতেন।
## বিশ্ব মুসলিম উম্মাহর প্রতি দরদ ও আন্তর্জাতিক অবদান
তিনি কেবল একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের আলেম ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন পুরো বিশ্বের মুসলিম উম্মাহর এক দরদী অভিভাবক। ফিলিস্তিন, বসনিয়া, আফগানিস্তান, কাশ্মীর থেকে শুরু করে আফ্রিকার দারিদ্র্যপীড়িত মুসলিমদের যেকোনো সংকটে তিনি সবচেয়ে আগে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতেন।
তিনি ‘ওয়ার্ল্ড সুপ্রিম কাউন্সিল ফর মাসজিদ’ এবং ‘রাবেতা আল-আলম আল-ইসলামী’ (মুসলিম ওয়ার্ল্ড লিগ)-এর মতো আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য ও নীতি-নির্ধারক ছিলেন। তাঁর ব্যক্তিগত উদ্যোগে ও নির্দেশনায় ইউরোপ, আমেরিকা, আফ্রিকা এবং এশিয়ার বহু দেশে শত শত মসজিদ, ইসলামী সেন্টার এবং মাদরাসা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সংখ্যালঘু মুসলিম দেশে ইসলামী দাওয়াহ পৌঁছে দেওয়ার জন্য তিনি নিজের তহবিল থেকে কোটি কোটি রিয়াল ব্যয় করতেন।
## রচনাবলি ও সাহিত্যিক অবদান
দৃষ্টিহীন হওয়ায় তিনি নিজে হাতে লিখতে পারতেন না। তিনি মুখে মুখে বলতেন এবং তাঁর ছাত্র ও সচিবরা তা লিখে রাখতেন। এভাবে তিনি অসংখ্য মূল্যবান গ্রন্থ, প্রবন্ধ এবং ফতোয়া রচনা করেছেন। তাঁর সবচেয়ে বড় সাহিত্যিক অবদান হলো:
- মাজমুউ ফাতাওয়া ওয়া মাকালাত মুতানাওয়িআহ: এটি তাঁর সারা জীবনের দেওয়া ফতোয়া, রেডিওতে দেওয়া প্রশ্নোত্তর এবং প্রবন্ধের এক সুবিশাল সংকলন, যা ৩০ খণ্ডেরও বেশি খণ্ডে প্রকাশিত হয়েছে। ইসলামী আকাইদ, ইবাদত, লেনদেন এবং সমসাময়িক প্রায় প্রতিটি বিষয়ের সমাধান এতে রয়েছে।
- আত-তাহকিক ওয়াল ইদাহ লি কাসিরিম মিন মাসায়িলিল হাজ্জি ওয়াল উমরাহ: হজ ও উমরার মাসআলা নিয়ে রচিত এটি একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় গ্রন্থ, যা লাখ লাখ হাজির জন্য গাইডবুক হিসেবে কাজ করে।
- ফাতহুল বারীর ওপর টিকা: ইমাম ইবনে হাজার আল-আসকালানী (রহ.) রচিত বুখারী শরিফের বিখ্যাত ব্যাখ্যাগ্রন্থ ‘ফাতহুল বারী’-এর কিছু অংশের ওপর তিনি অত্যন্ত জ্ঞানগর্ভ নোট বা টিকা যুক্ত করেছেন।
## ইন্তেকাল ও জানাযা
মুসলিম উম্মাহর এই মহান অভিভাবক ও শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ আলেম ১৯৯৯ সালের ১৩ মে (২৭ মুহাররম, ১৪২০ হিজরি) রোজ বৃহস্পতিবার তায়েফ শহরে ইন্তেকাল করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল প্রায় ৯০ বছর।
তাঁর ইন্তেকালের খবরে পুরো মুসলিম বিশ্বে শোকের ছায়া নেমে আসে। পরদিন শুক্রবার পবিত্র মক্কার মসজিদুল হারামে তাঁর জানাযা অনুষ্ঠিত হয়। সেদিনের জানাযায় প্রায় পঁচিশ লাখ (২.৫ মিলিয়ন) মানুষ অংশগ্রহণ করেন, যা মক্কার ইতিহাসে স্মরণকালের অন্যতম বৃহৎ জানাযা ছিল। সৌদি আরবের তৎকালীন বাদশা থেকে শুরু করে সাধারণ দিনমজুর পর্যন্ত সকলেই এই মহান আলেমের বিদায়বেলায় কান্নায় ভেঙে পড়েন। মক্কার বিখ্যাত ‘আল-আদল’ কবরস্থানে তাঁকে সমাহিত করা হয়।
শাইখ আব্দুল আযীয ইবনে বায (রহ.) তাঁর ইলম, আমল, ইখলাস এবং উম্মাহর প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসার যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন, তা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে জ্ঞানপিপাসুদের জন্য আলোকবর্তিকা হয়ে থাকবে।
(আপনার পরবর্তী নির্দেশনার পর আমি তৃতীয় মেসেজে শাইখ মুহাম্মাদ ইবনে সালিহ আল-উসাইমীন (রহ.)-এর বিস্তারিত জীবনী পেশ করব ইনশাআল্লাহ।)