ইসলামি আইনশাস্ত্র বা ফিকহের চার মহান ইমামের ধারায় কালানুক্রমিকভাবে তৃতীয় এবং ফিকহ ও হাদিসের এক অপূর্ব সমন্বয়কারী যুগান্তকারী ব্যক্তিত্ব হলেন ইমাম শাফেয়ি (রহ.)। তিনি ‘উসুলুল ফিকহ’ বা ইসলামি আইনশাস্ত্রের মূলনীতির জনক হিসেবে সমগ্র মুসলিম বিশ্বে চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন। মদিনার ‘আহলুল হাদিস’ (হাদিসপন্থী) এবং ইরাকের ‘আহলুর রায়’ (যুক্তিবাদী বা ফিকহপন্থী) ধারার মধ্যে এক ঐতিহাসিক সেতুবন্ধন রচনা করে তিনি ইসলামি জ্ঞানরাজ্যে এক অনন্য বিপ্লব সাধন করেছেন। নিচে এই মহান জ্ঞানতাপসের জীবনী, অবদান, বিখ্যাত গ্রন্থাবলি এবং তাঁর জীবনের প্রসিদ্ধ ঘটনাবলি বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো ইনশাআল্লাহ।
জন্ম, বংশ পরিচয় ও প্রাথমিক জীবন
ইমাম শাফেয়ি (রহ.)-এর পুরো নাম আবু আবদুল্লাহ মুহাম্মদ ইবনে ইদরিস আশ-শাফেয়ি। তাঁর বংশপরিক্রমা কুরাইশ বংশের বনু মুত্তালিব শাখার সাথে মিলিত হয়েছে। অর্থাৎ, তাঁর বংশধারা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ঊর্ধ্বস্তন পুরুষ আবদে মানাফের সাথে গিয়ে মিলেছে। এই দিক থেকে তিনি চার ইমামের মধ্যে একমাত্র কুরাইশি এবং হাশেমি বংশোদ্ভূত। তিনি ১৫০ হিজরি (৭৬৭ খ্রিস্টাব্দ) মোতাবেক ফিলিস্তিনের গাজা নামক স্থানে জন্মগ্রহণ করেন। কাকতালীয়ভাবে এটি সেই বছর, যে বছর ইমাম আবু হানিফা (রহ.) ইন্তেকাল করেন। এ কারণে তৎকালীন আলেমগণ বলতেন, “এক ইমামের বিদায় হলো, আরেক ইমামের উদয় হলো।”
শৈশবেই তিনি পিতৃহারা হন এবং চরম দারিদ্র্যের সম্মুখীন হন। তাঁর মাতা, যিনি ইয়েমেনের বিখ্যাত আজদ গোত্রের নারী ছিলেন, সন্তানের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে তাকে নিয়ে পিতৃভূমি মক্কায় চলে আসেন। তখন তাঁর বয়স ছিল মাত্র দুই বছর। মক্কায় তিনি অত্যন্ত দারিদ্র্যের মধ্যে বড় হন। কাগজ কেনার সামর্থ্য না থাকায় তিনি উটের হাড়, চামড়া ও মাটির টুকরোর ওপর লিখে ইলম চর্চা করতেন।
শিক্ষা ও জ্ঞানার্জন
ইমাম শাফেয়ি (রহ.)-এর মেধা ও স্মরণশক্তি ছিল প্রবাদতুল্য। মাত্র সাত বছর বয়সে তিনি সম্পূর্ণ কোরআন হিফজ করেন এবং মাত্র দশ বছর বয়সে ইমাম মালিক (রহ.)-এর বিখ্যাত হাদিস গ্রন্থ ‘আল-মুওয়াত্তা’ সম্পূর্ণ মুখস্থ করে ফেলেন। ১৫ বছর বয়সেই তিনি মক্কার তৎকালীন মুফতির কাছ থেকে ফতোয়া প্রদানের অনুমতি লাভ করেন।
ইসলামি জ্ঞানের পাশাপাশি তিনি খাঁটি আরবি ভাষা ও সাহিত্য আয়ত্ত করার দিকে মনোনিবেশ করেন। এজন্য তিনি মক্কার অদূরে মরুভূমিতে বসবাসকারী ‘বনু হুজাইল’ গোত্রের সাথে দীর্ঘ দশ বছর সময় কাটান। এই গোত্রটি সমগ্র আরবে শুদ্ধতম আরবি ভাষা এবং উচ্চাঙ্গের কবিতার জন্য বিখ্যাত ছিল। সেখানে থেকে তিনি আরবি ভাষা, ব্যাকরণ এবং প্রাচীন আরব কবিতায় অসামান্য পাণ্ডিত্য অর্জন করেন।
এরপর মক্কার আলেমদের পরামর্শে তিনি উচ্চশিক্ষার জন্য মদিনায় ইমাম মালিক (রহ.)-এর দরবারে উপস্থিত হন। সেখানে তিনি দীর্ঘ নয় বছর ইমাম মালিক (রহ.)-এর ইন্তেকাল পর্যন্ত তাঁর সান্নিধ্যে থেকে হাদিস ও ফিকহের অগাধ জ্ঞান অর্জন করেন। পরবর্তীতে তিনি ইয়েমেনে কিছুদিন সরকারি দায়িত্ব পালন করেন এবং এরপর ইরাকে গমন করেন। ইরাকে তিনি ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর শ্রেষ্ঠ ছাত্র ইমাম মুহাম্মদ ইবনে হাসান আশ-শাইবানি (রহ.)-এর কাছে ফিকহে হানাফি অধ্যয়ন করেন। এর ফলে তাঁর মধ্যে মদিনার হাদিস-ভিত্তিক ধারা এবং ইরাকের কিয়াস বা যুক্তি-ভিত্তিক ধারার এক অপূর্ব সমন্বয় ঘটে।
ইসলামের জন্য অবদান ও ফিকহ সংকলন
ইমাম শাফেয়ি (রহ.)-এর সর্বশ্রেষ্ঠ অবদান হলো ‘উসুলুল ফিকহ’ বা আইন প্রণয়নের মূলনীতি আবিষ্কার ও সংকলন। তাঁর পূর্বে ফিকহের কোনো সুনির্দিষ্ট লিখিত মূলনীতি ছিল না। তিনি কোরআন, সুন্নাহ, ইজমা (ঐকমত্য) এবং কিয়াস (সাদৃশ্যমূলক অনুমান)-এর আলোকে আইন প্রণয়নের একটি সুশৃঙ্খল বৈজ্ঞানিক কাঠামো তৈরি করেন। তাঁর এই পদ্ধতি ফিকহ শাস্ত্রকে ব্যক্তিগত মতামতের প্রভাব থেকে মুক্ত করে একটি সুনির্দিষ্ট কাঠামোর ওপর দাঁড় করায়।
ইমাম শাফেয়ি (রহ.)-এর ফিকহি জীবনে দুটি পর্যায় রয়েছে: ‘মাজহাবুল কদিম’ (পুরাতন মতবাদ) এবং ‘মাজহাবুল জাদিদ’ (নতুন মতবাদ)। ইরাকে অবস্থানকালে তিনি যে ফতোয়াগুলো দিয়েছিলেন, তা ‘পুরাতন মতবাদ’ হিসেবে পরিচিত। পরবর্তীতে ১৯৯ হিজরিতে তিনি যখন মিশরে স্থানান্তরিত হন, তখন সেখানকার নতুন পরিবেশ, ভিন্ন সামাজিক প্রেক্ষাপট এবং নতুন কিছু হাদিসের সন্ধান পাওয়ায় তিনি তাঁর পূর্ববর্তী অনেক ফতোয়া সংশোধন করেন ও নতুনভাবে ফিকহ সংকলন করেন। এটি ‘নতুন মতবাদ’ নামে পরিচিত। সময়ের সাথে সাথে কোরআন-সুন্নাহর আলোকে ফতোয়ার পরিবর্তন করার এই মানসিকতা তাঁর বুদ্ধিবৃত্তিক সততা ও গতিশীলতার এক বিশাল প্রমাণ।
বিখ্যাত গ্রন্থাবলি
ইমাম শাফেয়ি (রহ.) বহু মূল্যবান গ্রন্থ রচনা করেছেন, যা আজও ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠ্য হিসেবে সমাদৃত:
১. আর-রিসালাহ (Al-Risala): এটি তাঁর জীবনের সবচেয়ে যুগান্তকারী গ্রন্থ। ইসলামি ইতিহাসে এটিই ‘উসুলুল ফিকহ’ বা আইন প্রণয়নের মূলনীতির ওপর রচিত প্রথম পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থ। এই গ্রন্থে তিনি প্রমাণ করেছেন কীভাবে কোরআন ও সুন্নাহ থেকে আইন উদ্ঘাটন করতে হয় এবং পরস্পর বিরোধী মনে হওয়া হাদিসগুলোর মধ্যে কীভাবে সমন্বয় সাধন করতে হয়।
২. কিতাবুল উম্ম (Kitab al-Umm): এটি তাঁর ফিকহ শাস্ত্রের বিশাল বিশ্বকোষ। মিশরে অবস্থানকালে তিনি তাঁর ‘নতুন মতবাদ’ বা ফতোয়াগুলো এই গ্রন্থে সংকলন করেন। এটি শাফেয়ি মাযহাবের সবচেয়ে মৌলিক ও প্রামাণ্য গ্রন্থ।
৩. আল-মুসনাদ (Musnad al-Shafi’i): এটি তাঁর বর্ণিত হাদিসসমূহের একটি সংকলন, যা মূলত তাঁর ছাত্ররা সংকলন করেছেন।
৪. দিওয়ানে শাফেয়ি (Diwan al-Shafi’i): তিনি একজন উচ্চমাপের কবিও ছিলেন। তাঁর রচিত জ্ঞানগর্ভ, নীতিমূলক ও আধ্যাত্মিক কবিতাগুলোর সংকলন হলো এই দিওয়ান, যা আরবি সাহিত্যের এক অমূল্য রত্ন।
প্রসিদ্ধ ঘটনাবলি
ইমাম শাফেয়ি (রহ.)-এর জীবনের বেশ কিছু ঘটনা তাঁর প্রজ্ঞা ও তাকওয়ার পরিচয় বহন করে:
১. ইমাম মালিকের সাথে প্রথম সাক্ষাৎ: তিনি যখন মদিনায় ইমাম মালিক (রহ.)-এর কাছে জ্ঞান অর্জনের উদ্দেশ্যে যান, তখন ইমাম মালিক তাঁর চোখের দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, “হে মুহাম্মদ! আল্লাহ তায়ালা তোমার অন্তরে একটি বিশেষ নূর (আলো) ঢেলে দিয়েছেন। তুমি পাপের অন্ধকারে লিপ্ত হয়ে এই নূরকে নিভিয়ে দিও না।” এরপর তিনি যখন স্মৃতি থেকে মুখস্থ ‘মুওয়াত্তা’ পাঠ করা শুরু করেন, তখন ইমাম মালিক তাঁর অনর্গল পাঠ ও সুললিত কণ্ঠ শুনে মুগ্ধ হয়ে যান।
২. খলিফা হারুনুর রশিদের দরবারে বিচার: ইয়েমেনে অবস্থানকালে কিছু ষড়যন্ত্রকারী তাঁর বিরুদ্ধে আব্বাসীয় খলিফা হারুনুর রশিদের কাছে মিথ্যা অভিযোগ করে যে, তিনি শিয়াদের সাথে মিলে বিদ্রোহের ষড়যন্ত্র করছেন। তাঁকে শিকলবদ্ধ অবস্থায় বাগদাদে খলিফার দরবারে আনা হয়। তখন তাঁর বুদ্ধিমত্তা, উপস্থিত বুদ্ধি এবং কোরআন-সুন্নাহ ভিত্তিক অকাট্য যুক্তির মাধ্যমে তিনি নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করেন। খলিফা তাঁর পাণ্ডিত্য দেখে এতটাই মুগ্ধ হন যে, তাঁকে সসম্মানে মুক্তি দেন এবং প্রচুর অর্থ উপহার দেন।
৩. জ্ঞানের প্রতি চরম সততা: তাঁর একজন বিখ্যাত ছাত্র ছিলেন ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.) (যিনি পরবর্তীতে চতুর্থ মাযহাবের রূপকার হন)। ইমাম শাফেয়ি (রহ.) তাঁর এই ছাত্রের হাদিসের জ্ঞানের প্রতি এত বেশি শ্রদ্ধাশীল ছিলেন যে, তিনি প্রায়ই বলতেন, “হাদিসের ব্যাপারে তোমরা আমার চেয়ে বেশি জানো। যখন কোনো বিশুদ্ধ হাদিস পাবে, তা আমাকে জানাবে, যেন আমি তার ভিত্তিতে ফতোয়া দিতে পারি।” শিক্ষক হয়েও ছাত্রের জ্ঞানের প্রতি এই সম্মান প্রদর্শন ইতিহাসে বিরল।
বিখ্যাত প্রবাদ ও উক্তি
তাঁর রচিত কবিতা ও উক্তিগুলো মুসলিম বিশ্বে প্রবাদের মতো ব্যবহৃত হয়:
১. “আমি আমার শিক্ষক ওয়াকি-এর কাছে আমার খারাপ স্মরণশক্তির অভিযোগ করলাম। তিনি আমাকে পাপ বর্জন করার নির্দেশ দিলেন এবং বললেন, ‘ইলম হলো আল্লাহর পক্ষ থেকে এক প্রকার আলো, আর আল্লাহর এই আলো কোনো পাপী ব্যক্তিকে দেওয়া হয় না’।”
২. “সময় হলো একটি ধারালো তলোয়ারের মতো। তুমি যদি একে সঠিক কাজে ব্যবহার করে না কাটো, তবে সে তোমাকে কেটে ফেলবে।”
৩. “জ্ঞান তা নয় যা কেবল মুখস্থ করা হয়; জ্ঞান হলো তা, যা মানুষের কল্যাণে আসে (উপকার করে)।”
৪. “আমি বিতর্ক করার সময় কখনো চাইনি যে আমার প্রতিপক্ষ ভুল করুক। আমি কেবল চেয়েছি সত্য প্রকাশিত হোক, তা আমার জিহ্বা দিয়ে হোক বা তার জিহ্বা দিয়ে হোক।”
৫. “যে ব্যক্তি যৌবনে জ্ঞান অর্জন থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, তার জীবনের ওপর চারটি তাকবির পড়ে দাও (অর্থাৎ তাকে মৃত বলে গণ্য করো)।”
চরিত্র, ইবাদত ও তাকওয়া
ইমাম শাফেয়ি (রহ.) ছিলেন একাধারে একজন মুজতাহিদ, মুহাদ্দিস এবং অত্যন্ত ইবাদতগুজার ব্যক্তি। তিনি রাতকে তিন ভাগে ভাগ করে নিতেন: এক ভাগ জ্ঞান চর্চা ও গ্রন্থ রচনার জন্য, এক ভাগ নফল ইবাদতের জন্য এবং বাকি এক ভাগ বিশ্রামের জন্য। রমজান মাসে তিনি দিনে একবার এবং রাতে একবার, মোট ৬০ বার সম্পূর্ণ কোরআন খতম করতেন। তাঁর দানশীলতাও ছিল অসীম। খলিফা বা ধনীদের কাছ থেকে পাওয়া বিশাল অংকের অর্থ তিনি মক্কায় পৌঁছানোর আগেই পথে গরিব-দুঃখীদের মাঝে বিলিয়ে দিতেন।
ইন্তেকাল
জীবনের শেষভাগে মিশরে অবস্থানকালে তিনি অর্শ বা পাইলস রোগে মারাত্মকভাবে আক্রান্ত হন। অসুস্থতার কারণে তাঁর প্রচুর রক্তক্ষরণ হতো, তবুও তিনি তাঁর জ্ঞান চর্চা, শিক্ষাদান এবং গ্রন্থ রচনার কাজ বন্ধ করেননি। অবশেষে ২০৪ হিজরি (৮২০ খ্রিস্টাব্দ) মোতাবেক ৫৪ বছর বয়সে পবিত্র জুমার রাতে মিশরের ফুস্তাত নগরীতে এই মহান ইমাম ইন্তেকাল করেন। তাঁকে মিশরের কায়রোতে দাফন করা হয়, যেখানে আজও তাঁর মাজার মুসলিম বিশ্বের অন্যতম দর্শনীয় স্থান হিসেবে সংরক্ষিত রয়েছে।
তাঁর প্রজ্ঞা, লেখনী এবং উসুলুল ফিকহের অনন্য আবিষ্কারের মাধ্যমে ইমাম শাফেয়ি (রহ.) ইসলামি শরিয়তের আকাশে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র হয়ে আছেন। বর্তমানে মিশর, সিরিয়া, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া এবং পূর্ব আফ্রিকার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে শাফেয়ি মাযহাব ব্যাপকভাবে অনুসৃত হচ্ছে, যা তাঁর বিশাল ইলমি উত্তরাধিকারের চিরন্তন প্রমাণ।