‘আরবাঈন’ মানে চল্লিশ। ইসলামি পরিভাষায় এমন ৪০টি হাদিস একত্রে সংকলন করা, যা দ্বীনের মৌলিক বিষয়াবলিকে ধারণ করে—এটি একটি প্রাচীন সুন্নাহ। রাসুল (সা.)-এর একটি (যয়ীফ সনদে বর্ণিত হলেও ফাযায়েল বা আমলের ক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্য) হাদিসের অনুপ্রেরণায় অনেক মুহাদ্দিস এমন সংকলন করেছেন।
তবে ইমাম নববী (রহ.)-এর এই সংকলনটি বিশ্বব্যাপী সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়তা পেয়েছে। এখানে মূলত ৪২টি হাদিস রয়েছে। তিনি অত্যন্ত সতর্কতার সাথে বুখারি, মুসলিম ও অন্যান্য বিশুদ্ধ গ্রন্থ থেকে এমন সব হাদিস চয়ন করেছেন, যা ইসলামের আকিদা, ফিকহ, আখলাক বা শিষ্টাচারের মূল ভিত্তি বা ‘জাওয়ামিউল কালিম’ (অল্প কথায় ব্যাপক অর্থবোধক)।
হাদিস – ১: নিয়তের গুরুত্ব
রাবী: উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)।
আরবি, উচ্চারণ ও শব্দার্থ:
عَنْ أَمِيرِ الْمُؤْمِنِينَ (আন আমিরিল মুমিনিন – আমিরুল মুমিনিন হতে) أَبِي حَفْصٍ (আবি হাফসিন – আবু হাফস) عُمَرَ بْنِ الْخَطَّابِ (উমারা ইবনিল খাত্তাব – উমর ইবনুল খাত্তাব) رَضِيَ اللهُ عَنْهُ (রাদিয়াল্লাহু আনহু – আল্লাহ তার প্রতি সন্তুষ্ট হোন) قَالَ (কালা – তিনি বলেন):
سَمِعْتُ (সামি’তু – আমি শুনেছি) رَسُولَ اللَّهِ (রাসুলুল্লাহি – রাসুলুল্লাহকে) ﷺ يَقُولُ (ইয়াকুলু – বলতে):
إِنَّمَا الْأَعْمَالُ (ইন্নামাল আ’মালু – যাবতীয় আমল নিহিত) بِالنِّيَّاتِ (বিন্নিইয়্যাত – নিয়তের উপর), وَإِنَّمَا (ওয়া ইন্নামা – এবং নিশ্চয়ই) لِكُلِّ امْرِئٍ (লিকুল্লিমরিয়িন – প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য তা-ই প্রাপ্য) مَا نَوَى (মা নাওয়া – যা সে নিয়ত করেছে)।
فَمَنْ كَانَتْ (ফামান কানাত – অতঃপর যার হয়েছে) هِجْرَتُهُ (হিজরাতুহু – হিজরত) إِلَى اللَّهِ (ইলাল্লাহি – আল্লাহর দিকে) وَرَسُولِهِ (ওয়া রাসুলিহি – ও তাঁর রাসুলের দিকে), فَهِجْرَتُهُ (ফাহিজরাতুহু – তার হিজরত) إِلَى اللَّهِ وَرَسُولِهِ (ইলাল্লাহি ওয়া রাসুলিহি – আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের দিকে হয়েছে বলেই গণ্য হবে)।
وَمَنْ كَانَتْ (ওয়া মান কানাত – আর যার হবে) هِجْرَتُهُ (হিজরাতুহু – হিজরত) لِدُنْيَا يُصِيبُهَا (লিদুনয়া ইউসিবুহা – দুনিয়া লাভের উদ্দেশ্যে) أَوْ امْرَأَةٍ (আও ইমরাআতিন – অথবা কোনো নারীর উদ্দেশ্যে) يَنْكِحُهَا (ইয়ানকিহুহা – যাকে সে বিবাহ করবে), فَهِجْرَتُهُ (ফাহিজরাতুহু – তবে তার হিজরত) إِلَى مَا هَاجَرَ إِلَيْهِ (ইলা মা হাজারা ইলাইহি – সেই উদ্দেশ্যেই হবে যার জন্য সে হিজরত করেছে)।
পূর্ণাঙ্গ বঙ্গানুবাদ:
আমিরুল মুমিনিন আবু হাফস উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে বলতে শুনেছি: “যাবতীয় আমল নিয়তের উপর নির্ভরশীল। আর মানুষের জন্য তা-ই প্রাপ্য, যার সে নিয়ত করেছে। অতএব, যার হিজরত (দেশত্যাগ) আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের উদ্দেশ্যে হবে, তার হিজরত আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের উদ্দেশ্যেই গণ্য হবে। আর যার হিজরত দুনিয়া অর্জন কিংবা কোনো নারীকে বিবাহের উদ্দেশ্যে হবে, তার হিজরত সেই উদ্দেশ্যেই গণ্য হবে, যে উদ্দেশ্যে সে হিজরত করেছে।” (সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম)
হাদিস – ২: জিবরীল (আ.)-এর হাদিস
রাবী: উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)।
আরবি, উচ্চারণ ও শব্দার্থ:
عَنْ عُمَرَ (আন উমারা – উমর হতে) رَضِيَ اللهُ عَنْهُ (রাদিয়াল্লাহু আনহু – আল্লাহ তার প্রতি সন্তুষ্ট হোন) أَيْضًا (আইদান – আরও) قَالَ (কালা – তিনি বলেন):
بَيْنَمَا نَحْنُ (বাইনামা নাহনু – একদিন যে সময় আমরা) جُلُوسٌ (জুলুসুন – উপবিষ্ট ছিলাম) عِنْدَ رَسُولِ اللَّهِ (ইনদা রাসুলিল্লাহি – রাসুলুল্লাহর নিকটে) ﷺ ذَاتَ يَوْمٍ (যাতা ইয়াওমিন – একদিন), إِذْ طَلَعَ عَلَيْنَا (ইয তালাআ আলাইনা – হঠাৎ আমাদের সামনে উদয় হলো) رَجُلٌ (রাজুলুন – এক ব্যক্তি) شَدِيدُ بَيَاضِ الثِّيَابِ (শাদিদু বায়াদিস সিয়াব – অত্যন্ত সাদা কাপড় পরিহিত), شَدِيدُ سَوَادِ الشَّعَرِ (শাদিদু সাওয়াদিশ শাআর – কুচকুচে কালো চুল বিশিষ্ট), لَا يُرَى عَلَيْهِ (লা ইউরা আলাইহি – তার উপর দেখা যাচ্ছিল না) أَثَرُ السَّفَرِ (আসারুস সাফারি – সফরের কোনো চিহ্ন), وَلَا يَعْرِفُهُ مِنَّا أَحَدٌ (ওয়ালা ইয়া’রিফুহু মিন্না আহাদুন – এবং আমাদের কেউ তাকে চিনতও না)।
حَتَّى جَلَسَ (হাত্তা জালাসা – এমনকি সে বসল) إِلَى النَّبِيِّ (ইলান নাবিয়্যি – নবীজির দিকে), فَأَسْنَدَ رُكْبَتَيْهِ (ফাআসনাদা রুকবাতাইহি – সে তার হাঁটু দুটি মিলিয়ে দিল) إِلَى رُكْبَتَيْهِ (ইলা রুকবাতাইহি – নবীজির হাঁটুর সাথে) وَوَضَعَ كَفَّيْهِ (ওয়া ওয়াদাআ কাফফাইহি – এবং তার হাতের তালু দুটি রাখল) عَلَى فَخِذَيْهِ (আলা ফাখিযাইহি – নবীজির ঊরুর উপর)।
وَقَالَ (ওয়া কালা – এবং বলল): يَا مُحَمَّدُ (ইয়া মুহাম্মাদু – হে মুহাম্মাদ), أَخْبِرْنِي (আখবিরনি – আমাকে জানান) عَنِ الْإِسْلَامِ (আনিল ইসলামি – ইসলাম সম্পর্কে)।
فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ (ফাকালা রাসুলুল্লাহি – রাসুলুল্লাহ বললেন): الْإِسْلَامُ (আল-ইসলামু – ইসলাম হলো) أَنْ تَشْهَدَ (আন তাশহাদা – তুমি এ সাক্ষ্য দেবে যে) أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ (আল-লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু – আল্লাহ ছাড়া সত্য কোনো ইলাহ নেই) وَأَنَّ مُحَمَّدًا رَسُولُ اللهِ (ওয়া আন্না মুহাম্মাদার রাসুলুল্লাহ – এবং মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসুল), وَتُقِيمَ الصَّلَاةَ (ওয়া তুকিমাস সালাতা – এবং সালাত কায়েম করবে), وَتُؤْتِيَ الزَّكَاةَ (ওয়া তু’তিয়ায যাকাআতা – যাকাত আদায় করবে), وَتَصُومَ رَمَضَانَ (ওয়া তাসুমা রমাদানা – রমজানের রোজা রাখবে), وَتَحُجَّ الْبَيْتَ (ওয়া তাহুজ্জাল বাইতা – এবং বাইতুল্লাহর হজ করবে) إِنِ اسْتَطَعْتَ إِلَيْهِ سَبِيلًا (ইনিসতাতা’তা ইলাইহি সাবিলা – যদি সেখানে যাওয়ার সামর্থ্য রাখো)।
قَالَ (কালা – সে বলল): صَدَقْتَ (সাদাকতা – আপনি সত্য বলেছেন)। فَعَجِبْنَا لَهُ (ফাআজিবনা লাহু – আমরা তার প্রতি বিস্মিত হলাম যে), يَسْأَلُهُ وَيُصَدِّقُهُ (ইয়াসআলুহু ওয়া ইউসাদ্দিকুহু – সে তাঁকে প্রশ্ন করছে আবার নিজেই সত্যায়ন করছে)।
قَالَ (কালা – সে বলল): فَأَخْبِرْنِي عَنِ الْإِيمَانِ (ফাআখবিরনি আনিল ঈমানি – তাহলে আমাকে ঈমান সম্পর্কে জানান)।
قَالَ (কালা – তিনি বললেন): أَنْ تُؤْمِنَ بِاللَّهِ (আন তু’মিনা বিল্লাহি – তুমি বিশ্বাস স্থাপন করবে আল্লাহর প্রতি), وَمَلَائِكَتِهِ (ওয়া মালায়িকাতিহি – তাঁর ফেরেশতাদের প্রতি), وَكُتُبِهِ (ওয়া কুতুবিহি – তাঁর কিতাবসমূহের প্রতি), وَرُسُلِهِ (ওয়া রুসুলিহি – তাঁর রাসুলগণের প্রতি), وَالْيَوْمِ الْآخِرِ (ওয়াল ইয়াওমিল আখিরি – এবং শেষ দিবসের প্রতি), وَتُؤْمِنَ بِالْقَدَرِ (ওয়া তু’মিনা বিল কাদরি – এবং তুমি বিশ্বাস করবে তাকদিরের প্রতি), خَيْرِهِ وَشَرِّهِ (খাইরিহি ওয়া শাররিহি – তার ভালোর ও মন্দের)।
قَالَ (কালা – সে বলল): صَدَقْتَ (সাদাকতা – আপনি সত্য বলেছেন)।
قَالَ (কালা – সে বলল): فَأَخْبِرْنِي عَنِ الْإِحْسَانِ (ফাআখবিরনি আনিল ইহসানি – আমাকে ইহসান সম্পর্কে জানান)।
قَالَ (কালা – তিনি বললেন): أَنْ تَعْبُدَ اللهَ (আন তা’বুদাল্লাহা – তুমি আল্লাহর ইবাদত করবে) كَأَنَّكَ تَرَاهُ (কাআন্নাকা তারাহু – যেন তুমি তাঁকে দেখছ), فَإِنْ لَمْ تَكُنْ تَرَاهُ (ফাইল-লাম তাকুন তারাহু – যদি তুমি তাঁকে দেখতে না পাও), فَإِنَّهُ يَرَاكَ (ফাইন্নাহু ইয়রাকা – তাহলে নিশ্চয়ই তিনি তোমাকে দেখছেন)।
قَالَ (কালা – সে বলল): فَأَخْبِرْنِي عَنِ السَّاعَةِ (ফাআখবিরনি আনিস সাআতি – আমাকে কিয়ামত সম্পর্কে জানান)।
قَالَ (কালা – তিনি বললেন): مَا الْمَسْئُولُ عَنْهَا (মাল মাসউয়ুলু আনহা – যাকে প্রশ্ন করা হচ্ছে তিনি এ ব্যাপারে নন) بِأَعْلَمَ مِنَ السَّائِلِ (বিআ’লামা মিনাস সায়িলি – প্রশ্নকারীর চেয়ে অধিক জ্ঞানী)।
قَالَ (কালা – সে বলল): فَأَخْبِرْنِي عَنْ أَمَارَاتِهَا (ফাআখবিরনি আন আমারাতিহা – তাহলে এর নিদর্শনগুলো সম্পর্কে জানান)।
قَالَ (কালা – তিনি বললেন): أَنْ تَلِدَ الْأَمَةُ (আন তালিদাল আমাতু – দাসী জন্ম দেবে) رَبَّتَهَا (রাব্বাতাহা – তার কর্ত্রীকে), وَأَنْ تَرَى (ওয়া আন তারা – এবং তুমি দেখতে পাবে যে) الْحُفَاةَ الْعُرَاةَ (আল-হুফাতাল উরাতা – খালি পা বিশিষ্ট ও বিবস্ত্র), الْعَالَةَ (আল-আলাতা – দরিদ্র), رِعَاءَ الشَّاءِ (রিআ’আশ শায়ি – মেষ পালকদেরকে) يَتَطَاوَلُونَ فِي الْبُنْيَانِ (ইয়াতাতাওয়ালুনা ফিল বুনইয়ানি – উঁচু দালানকোঠা নির্মাণে প্রতিযোগিতা করতে)।
ثُمَّ انْطَلَقَ (সুম্মান তালাকা – অতঃপর সে চলে গেল), فَلَبِثْتُ مَلِيًّا (ফালাবিসতু মালিয়্যা – আমি কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলাম)। ثُمَّ قَالَ (সুম্মা কালা – অতঃপর নবী বললেন): يَا عُمَرُ (ইয়া উমারু – হে উমর), أَتَدْرِي مَنِ السَّائِلُ؟ (আতাশরী মানিস সায়িলু – তুমি কি জানো প্রশ্নকারী কে ছিল?) قُلْتُ (কুলতু – আমি বললাম): اللهُ وَرَسُولُهُ أَعْلَمُ (আল্লাহু ওয়া রাসুলুহু আ’লাম – আল্লাহ ও তাঁর রাসুলই সবচেয়ে ভালো জানেন)। قَالَ (কালা – তিনি বললেন): فَإِنَّهُ جِبْرِيلُ (ফাইন্নাহু জিবরিলু – নিশ্চয়ই তিনি জিবরীল), أَتَاكُمْ (আকুম – তোমাদের কাছে এসেছিলেন) يُعَلِّمُكُمْ دِينَكُمْ (ইউআল্লিমুকুম দিনাকুম – তোমাদেরকে তোমাদের দ্বীন শেখাতে)।
পূর্ণাঙ্গ বঙ্গানুবাদ:
উমর (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন: একদিন আমরা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নিকট বসা ছিলাম। হঠাৎ ধবধবে সাদা কাপড় ও মিশমিশে কালো চুল বিশিষ্ট এক ব্যক্তি আমাদের সামনে উপস্থিত হলেন। তার মাঝে সফরের কোনো চিহ্ন দেখা যাচ্ছিল না এবং আমাদের কেউ তাকে চিনতেও পারল না। তিনি নবী (সা.)-এর নিকট এসে বসলেন। নিজের হাঁটু দুটি নবীজির হাঁটুর সাথে মিলিয়ে দিলেন এবং নিজের দুই হাতের তালু নবীজির দুই ঊরুর উপর রাখলেন।
এরপর বললেন, “হে মুহাম্মাদ! আমাকে ইসলাম সম্পর্কে বলুন।” রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, “ইসলাম হলো—তুমি এ সাক্ষ্য প্রদান করবে যে, আল্লাহ ছাড়া সত্য কোনো ইলাহ নেই এবং মুহাম্মাদ (সা.) আল্লাহর রাসুল, সালাত কায়েম করবে, যাকাত প্রদান করবে, রমজানের রোজা রাখবে এবং যদি সামর্থ্য থাকে তবে বাইতুল্লাহর হজ করবে।” লোকটি বললেন, “আপনি সত্য বলেছেন।” আমরা তার আচরণে বিস্মিত হলাম যে, সে নিজেই প্রশ্ন করছে আবার নিজেই সত্যায়ন করছে!
অতঃপর লোকটি বললেন, “আমাকে ঈমান সম্পর্কে বলুন।” নবীজি বললেন, “ঈমান হলো—তুমি বিশ্বাস স্থাপন করবে আল্লাহর প্রতি, তাঁর ফেরেশতাগণ, তাঁর কিতাবসমূহ, তাঁর রাসুলগণ ও পরকালের প্রতি এবং তুমি বিশ্বাস করবে তাকদিরের ভালো-মন্দের প্রতি।” লোকটি বললেন, “আপনি সত্য বলেছেন।”
লোকটি আবার বললেন, “আমাকে ইহসান সম্পর্কে বলুন।” নবীজি বললেন, “ইহসান হলো—তুমি এমনভাবে আল্লাহর ইবাদত করবে যেন তুমি তাঁকে দেখছ। আর যদি তুমি তাঁকে দেখতে না পাও, তবে (বিশ্বাস রাখবে যে) তিনি তোমাকে দেখছেন।”
লোকটি বললেন, “আমাকে কিয়ামত সম্পর্কে জানান।” নবীজি বললেন, “যাঁকে জিজ্ঞাসা করা হচ্ছে তিনি এ বিষয়ে জিজ্ঞাসাকারীর চেয়ে বেশি কিছু জানেন না।”
লোকটি বললেন, “তাহলে এর নিদর্শনগুলো সম্পর্কে জানান।” নবীজি বললেন, “দাসী তার মুনিবকে জন্ম দেবে এবং তুমি দেখতে পাবে যে, নগ্নপদ, বিবস্ত্র, দরিদ্র মেষপালকেরা উঁচু উঁচু দালানকোঠা নির্মাণের প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়েছে।”
উমর (রা.) বলেন, এরপর লোকটি চলে গেল। আমি কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলাম। তখন নবী (সা.) আমাকে বললেন, “হে উমর, তুমি কি জানো প্রশ্নকারী কে ছিল?” আমি বললাম, “আল্লাহ ও তাঁর রাসুলই অধিক জ্ঞাত।” নবীজি (সা.) বললেন, “তিনি ছিলেন জিবরীল (আ.)। তিনি তোমাদেরকে তোমাদের দ্বীন শেখাতে এসেছিলেন।” (সহিহ মুসলিম)
হাদিস – ৩: ইসলামের পঞ্চস্তম্ভ
রাবী: আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা.)।
আরবি, উচ্চারণ ও শব্দার্থ:
عَنْ أَبِي عَبْدِ الرَّحْمَنِ (আন আবি আবদির রহমানি – আবু আব্দুর রহমান হতে) عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عُمَرَ بْنِ الْخَطَّابِ (আব্দিল্লাহি বনি উমারা ব্নিল খাত্তাব – আব্দুল্লাহ ইবনে উমর ইবনুল খাত্তাব) رَضِيَ اللهُ عَنْهُمَا قَالَ (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা কালা – তিনি বলেন):
سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ (সামি’তু রাসুলুল্লাহি – আমি রাসুলুল্লাহকে শুনেছি) ﷺ يَقُولُ (ইয়াকুলু – বলতে):
بُنِيَ الْإِسْلَامُ (বুনিয়াল ইসলামু – ইসলামের ভিত্তি স্থাপিত হয়েছে) عَلَى خَمْسٍ (আলা খামসিন – পাঁচটি বিষয়ের উপর): شَهَادَةِ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ (শাহাদাতি আল-লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু – এই সাক্ষ্য দেওয়া যে, আল্লাহ ছাড়া সত্য কোনো ইলাহ নেই) وَأَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُولُهُ (ওয়া আন্না মুহাম্মাদান আবদুহু ওয়া রাসুলুহু – এবং মুহাম্মাদ তাঁর বান্দা ও রাসুল), وَإِقَامِ الصَّلَاةِ (ওয়া ইক্বামিস সালাতি – সালাত কায়েম করা), وَإِيتَاءِ الزَّكَاةِ (ওয়া ইতায়িয যাকাআতি – যাকাত আদায় করা), وَحَجِّ الْبَيْتِ (ওয়া হাজ্জিল বাইতি – বাইতুল্লাহর হজ করা), وَصَوْمِ رَمَضَانَ (ওয়া সাওমি রমাদানা – এবং রমজানের রোজা রাখা)।
পূর্ণাঙ্গ বঙ্গানুবাদ:
আবু আব্দুর রহমান আব্দুল্লাহ ইবনে উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে বলতে শুনেছি: “ইসলামের ভিত্তি পাঁচটি বিষয়ের উপর স্থাপিত—এ সাক্ষ্য দেওয়া যে, আল্লাহ ছাড়া আর কোনো সত্য ইলাহ নেই এবং মুহাম্মাদ (সা.) আল্লাহর বান্দা ও রাসুল, সালাত কায়েম করা, যাকাত প্রদান করা, বাইতুল্লাহর হজ করা এবং রমজান মাসের রোজা রাখা।” (সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম)
হাদিস – ৪: মানব সৃষ্টির স্তর এবং তাকদির
রাবী: আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)।
আরবি, উচ্চারণ ও শব্দার্থ:
عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ مَسْعُودٍ (আন আব্দিল্লাহি বনি মাসউদ – আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ হতে) رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ (রাদিয়াল্লাহু আনহু কালা – তিনি বলেন): حَدَّثَنَا رَسُولُ اللَّهِ (হাদ্দাসানা রাসুলুল্লাহি – রাসুলুল্লাহ আমাদের বর্ণনা করেছেন) ﷺ وَهُوَ الصَّادِقُ الْمَصْدُوقُ (ওয়া হুয়াস সাদিকুল মাসদুক – আর তিনি হলেন সত্যবাদী ও সত্যায়িত):
إِنَّ أَحَدَكُمْ (ইন্না আহাদাকুম – নিশ্চয়ই তোমাদের প্রত্যেকের) يُجْمَعُ خَلْقُهُ (ইউজমাউ খালকুহু – সৃষ্টির উপাদান একত্রিত করা হয়) فِي بَطْنِ أُمِّهِ (ফি বাতনি উম্মিহি – তার মায়ের পেটে) أَرْبَعِينَ يَوْمًا نُطْفَةً (আরবায়িনা ইয়াওমান নুতফাতান – চল্লিশ দিন শুক্রবিন্দুরূপে), ثُمَّ يَكُونُ عَلَقَةً مِثْلَ ذَلِكَ (সুম্মা ইয়াকুনু আলাকাতান মিসলা যালিকা – অতঃপর তা জমাট রক্তে পরিণত হয় ততদিন), ثُمَّ يَكُونُ مُضْغَةً مِثْلَ ذَلِكَ (সুম্মা ইয়াকুনু মুদগাতান মিসলা যালিকা – অতঃপর তা মাংসপিণ্ডে পরিণত হয় ততদিন)। ثُمَّ يُرْسَلُ إِلَيْهِ الْمَلَكُ (সুম্মা ইউরসালু ইলাইহিল মালাকু – অতঃপর তার কাছে ফেরেশতা প্রেরিত হয়), فَيَنْفُخُ فِيهِ الرُّوحَ (ফাইয়ানফুখু ফিহির রুহা – অতঃপর তিনি তাতে আত্মা ফুঁকে দেন), وَيُؤْمَرُ بِأَرْبَعِ كَلِمَاتٍ (ওয়া ইউ’মারু বিআরবাই কালিমাতিন – এবং চারটি কথা লেখার আদিষ্ট হন): بِكَتْبِ رِزْقِهِ (বিকাতবি রিযকিহি – তার রিযিক লেখার), وَأَجَلِهِ (ওয়া আজালিহি – তার বয়স), وَعَمَلِهِ (ওয়া আমালিহি – তার আমল), وَشَقِيٌّ أَوْ سَعِيدٌ (ওয়া শাকিয়্যুন আও সাঈদুন – এবং সে কি দুর্ভাগা নাকি সৌভাগ্যবান)।
فَوَاللَّهِ الَّذِي لَا إِلَهَ غَيْرُهُ (ফাওয়াল্লাহিল্লাযি লা ইলাহা গাইরুহু – অতঃপর সেই আল্লাহর শপথ যিনি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই), إِنَّ أَحَدَكُمْ لَيَعْمَلُ (ইন্না আহাদাকুম লাইয়া’মালু – নিশ্চয়ই তোমাদের কেউ আমল করে) بِعَمَلِ أَهْلِ الْجَنَّةِ (বিআমালি আহলিল জান্নাতি – জান্নাতিদের আমল), حَتَّى مَا يَكُونُ (হাত্তা মা ইয়াকুনু – এমনকি থাকে না) بَيْنَهُ وَبَيْنَهَا (বাইনাহু ওয়া বাইনাহা – তার ও জান্নাতের মাঝে) إِلَّا ذِرَاعٌ (ইল্লা যিরাউন – কেবল এক হাত দূরত্ব ব্যতীত), فَيَسْبِقُ عَلَيْهِ الْكِتَابُ (ফাইয়াসবিকু আলাইহিল কিতাবু – তখন তাকদিরের লিখন অগ্রগামী হয়), فَيَعْمَلُ بِعَمَلِ أَهْلِ النَّارِ (ফাইয়া’মালু বিআমালি আহলিন নারি – ফলে সে জাহান্নামীদের আমল করে), فَيَدْخُلُهَا (ফাইয়াদখুলুহা – এবং তাতে প্রবেশ করে)।
وَإِنَّ أَحَدَكُمْ لَيَعْمَلُ (ওয়া ইন্না আহাদাকুম লাইয়া’মালু – আর নিশ্চয়ই তোমাদের কেউ আমল করে) بِعَمَلِ أَهْلِ النَّارِ (বিআমালি আহলিন নারি – জাহান্নামীদের আমল), حَتَّى مَا يَكُونُ بَيْنَهُ وَبَيْنَهَا إِلَّا ذِرَاعٌ (এমনকি তার ও জাহান্নামের মাঝে এক হাত দূরত্ব বাকি থাকে), فَيَسْبِقُ عَلَيْهِ الْكِتَابُ (ফাইয়াসবিকু আলাইহিল কিতাবু – তখন তাকদিরের লিখন অগ্রগামী হয়), فَيَعْمَلُ بِعَمَلِ أَهْلِ الْجَنَّةِ (ফাইয়া’মালু বিআমালি আহলিল জান্নাতি – ফলে সে জান্নাতিদের আমল করে), فَيَدْخُلُهَا (ফাইয়াদখুলুহা – এবং তাতে প্রবেশ করে)।
পূর্ণাঙ্গ বঙ্গানুবাদ:
আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.)—যিনি সত্যবাদী এবং যাঁর কথাকে সত্য বলে মানা হয়—আমাদের নিকট বর্ণনা করেছেন: “নিশ্চয়ই তোমাদের প্রত্যেকের সৃষ্টির উপাদান তার মায়ের পেটে চল্লিশ দিন পর্যন্ত শুক্রবিন্দুরূপে জমা রাখা হয়। অতঃপর পরবর্তী চল্লিশ দিন তা জমাট রক্তরূপে থাকে। এরপর পরবর্তী চল্লিশ দিন তা গোশতের টুকরোরূপে থাকে। এরপর তার নিকট ফেরেশতা পাঠানো হয়, তিনি তার মাঝে রূহ (আত্মা) ফুঁকে দেন এবং তাঁকে চারটি বিষয় লিখে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়: তার রিযিক, তার আয়ু, তার আমল এবং সে কি দুর্ভাগ্যবান নাকি সৌভাগ্যবান তা লিখে দেওয়ার জন্য।
সুতরাং সেই আল্লাহর কসম, যিনি ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই! তোমাদের কেউ জান্নাতিদের আমল করতে থাকে, এমনকি তার ও জান্নাতের মাঝে মাত্র এক হাত দূরত্ব বাকি থাকে, এমন সময় তার উপর তাকদিরের লিখন অগ্রগামী হয়, তখন সে জাহান্নামীদের মতো আমল শুরু করে এবং পরিণামে সে জাহান্নামে প্রবেশ করে। আবার তোমাদের কেউ জাহান্নামীদের আমল করতে থাকে, এমনকি তার ও জাহান্নামের মাঝে মাত্র এক হাত দূরত্ব বাকি থাকে, এমন সময় তার উপর তাকদিরের লিখন অগ্রগামী হয়, তখন সে জান্নাতিদের মতো আমল শুরু করে এবং পরিণামে সে জান্নাতে প্রবেশ করে।” (সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম)
হাদিস – ৫: বিদআত প্রত্যাখ্যান
রাবী: আয়িশা (রা.)।
আরবি, উচ্চারণ ও শব্দার্থ:
عَنْ أُمِّ الْمُؤْمِنِينَ (আন উম্মিল মুমিনিন – উম্মুল মুমিনিন হতে) عَائِشَةَ رَضِيَ اللهُ عَنْهَا (আয়িশা রাদিয়াল্লাহু আনহা – আয়িশা (রা.)) قَالَتْ (কালাত – তিনি বলেন): قَالَ رَسُولُ اللَّهِ (কালা রাসুলুল্লাহি – রাসুলুল্লাহ বলেছেন) ﷺ:
مَنْ أَحْدَثَ (মান আহদাসা – যে ব্যক্তি নতুন কিছু উদ্ভাবন করল) فِي أَمْرِنَا هَذَا (ফি আমরিনা হা্যা – আমাদের এই দ্বীনের মাঝে) مَا لَيْسَ مِنْهُ (মা লাইসা মিনহু – যা এর অন্তর্ভুক্ত নয়), فَهُوَ رَدٌّ (ফাহুয়া রাদ্দুন – তবে তা প্রত্যাখ্যাত)।
পূর্ণাঙ্গ বঙ্গানুবাদ:
উম্মুল মুমিনিন আয়িশা (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: “যে ব্যক্তি আমাদের এই দ্বীনের মাঝে এমন নতুন কিছু উদ্ভাবন করল যা এর অন্তর্ভুক্ত নয়, তবে তা প্রত্যাখ্যাত।” (সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম)
হাদিস – ৬: হালাল, হারাম ও সন্দেহযুক্ত বিষয়
রাবী: নুমান ইবনে বাশির (রা.)।
আরবি, উচ্চারণ ও শব্দার্থ:
عَنِ النُّعْمَانِ بْنِ بَشِيرٍ (আনিন নুমানি বনি বাশিরিন – নুমান ইবনে বাশির হতে) قَالَ (কালা – তিনি বলেন): سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ (সামি’তু রাসুলুল্লাহি – আমি রাসুলুল্লাহকে বলতে শুনেছি) ﷺ يَقُولُ (ইয়াকুলু – বলতে):
إِنَّ الْحَلَالَ بَيِّنٌ (ইন্নাল হালালা বায়্যিনুন – নিশ্চয়ই হালাল সুস্পষ্ট), وَإِنَّ الْحَرَامَ بَيِّنٌ (ওয়া ইন্নাল হারামা বায়্যিনুন – আর নিশ্চয়ই হারাম সুস্পষ্ট)। وَبَيْنَهُمَا أُمُورٌ مُشْتَبِهَاتٌ (ওয়া বাইনাহুমা উমুরুম মুশতাবিহাতুন – আর এ দুটোর মাঝে সন্দেহযুক্ত বিষয় রয়েছে), لَا يَعْلَمُهُنَّ كَثِيرٌ مِنَ النَّاسِ (লা ইয়া’লামুহুন্না কাসিরুম মিনান নাসি – যা অধিকাংশ মানুষ জানে না)।
فَمَنِ اتَّقَى الشُّبُهَاتِ (ফামানিত্তাকাশ শুবুহাতি – অতঃপর যে ব্যক্তি সন্দেহযুক্ত বিষয়গুলো থেকে বেঁচে থাকল), اسْتَبْرَأَ لِدِينِهِ وَعِرْضِهِ (ইসতাবরাআ লিদিনিহি ওয়া ইরদিহি – সে তার দ্বীন ও সম্মানকে পবিত্র রাখল)। وَمَنْ وَقَعَ فِي الشُّبُهَاتِ (ওয়া মান ওয়াকাআ ফিশ শুবুহাতি – আর যে সন্দেহযুক্ত বিষয়ে পতিত হলো), وَقَعَ فِي الْحَرَامِ (ওয়াকাআ ফিল হারামি – সে হারামে পতিত হলো)।
كَالرَّاعِي (কার রায়ি – যেমন রাখাল) يَرْعَى حَوْلَ الْحِمَى (ইয়ারআ হাওলাল হিমা – সংরক্ষিত চারণভূমির আশপাশে পশু চরায়), يُوشِكُ أَنْ يَرْتَعَ فِيهِ (ইউশিকু আন ইয়ারতাআ ফিহি – যেকোনো সময় ভেতরে চরিয়ে ফেলার আশঙ্কা থাকে)।
أَلَا (আলা – জেনে রাখো), وَإِنَّ لِكُلِّ مَلِكٍ حِمًى (ওয়া ইন্না লিকুল্লি মালিকিন হিমান – নিশ্চয়ই প্রত্যেক রাজার সংরক্ষিত সীমানা রয়েছে)। أَلَا (আলা – জেনে রাখো), وَإِنَّ حِمَى اللَّهِ مَحَارِمُهُ (ওয়া ইন্না হিমাল্লাহি মাহারিমুহু – আল্লাহর সংরক্ষিত সীমানা হলো তাঁর হারামকৃত বিষয়সমূহ)।
أَلَا (আলা – জেনে রাখো), وَإِنَّ فِي الْجَسَدِ مُضْغَةً (ওয়া ইন্না ফিল জাসাদি মুদগাতান – নিশ্চয়ই শরীরে একটি মাংসপিণ্ড রয়েছে), إِذَا صَلَحَتْ (ইযা সালাহাত – যখন তা ঠিক থাকে) صَلَحَ الْجَسَدُ كُلُّهُ (সালাহাল জাসাদু কুল্লুহু – পুরো শরীর ঠিক থাকে), وَإِذَا فَسَدَتْ (ওয়া ইযা ফাসাদাত – আর যখন তা নষ্ট হয়ে যায়) فَسَدَ الْجَسَدُ كُلُّهُ (ফাসাদাল জাসাদু কুল্লুহু – পুরো শরীর নষ্ট হয়ে যায়)। أَلَا وَهِيَ الْقَلْبُ (আলা ওয়া হিয়াল কালবু – জেনে রাখো, তা হলো অন্তর)।
পূর্ণাঙ্গ বঙ্গানুবাদ:
নুমান ইবনে বাশির (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে বলতে শুনেছি: “নিশ্চয়ই হালাল সুস্পষ্ট এবং হারামও সুস্পষ্ট। আর এই উভয়ের মাঝে এমন অনেক সন্দেহযুক্ত বিষয় রয়েছে, যা অধিকাংশ মানুষই জানে না। অতএব যে ব্যক্তি সন্দেহযুক্ত বিষয়গুলো থেকে বেঁচে থাকল, সে তার দ্বীন এবং সম্মানকে পবিত্র ও নিরাপদ রাখল। আর যে ব্যক্তি সন্দেহযুক্ত কাজে লিপ্ত হলো, সে হারামে লিপ্ত হলো। তার দৃষ্টান্ত সেই রাখালের মতো, যে অন্যের সংরক্ষিত চারণভূমির আশপাশে পশু চরায়; যেকোনো সময় সে ওই সংরক্ষিত সীমানায় পশু চরিয়ে ফেলার আশঙ্কা থাকে। জেনে রাখো! প্রত্যেক বাদশারই একটি সংরক্ষিত সীমানা থাকে। আর আল্লাহর সংরক্ষিত সীমানা হলো তাঁর হারামকৃত বিষয়সমূহ। জেনে রাখো! মানবদেহের ভেতরে একটি গোশতের টুকরো আছে; যখন তা সুস্থ ও সঠিক থাকে তখন পুরো শরীরই ঠিক থাকে। আর যখন তা নষ্ট হয়ে যায় তখন পুরো শরীরই নষ্ট হয়ে যায়। জেনে রাখো, সেটি হলো অন্তর (কলব)।” (সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম)
হাদিস – ৭: দ্বীন হলো কল্যাণকামিতা
রাবী: তামীম আদ-দারী (রা.)।
আরবি, উচ্চারণ ও শব্দার্থ:
عَنْ تَمِيمِ بْنِ أَوْسٍ الدَّارِيِّ (আন তামিমি বনি আওসিন আদ-দারিয়্যি – তামীম আদ-দারী হতে), أَنَّ النَّبِيَّ (আন্নান নাবিয়্যা – নিশ্চয়ই নবী) ﷺ قَالَ (কালা – বলেছেন):
الدِّينُ النَّصِيحَةُ (আদ-দিনুন নাসিহাহ – দ্বীন হলো কল্যাণকামিতা/আন্তরিকতা)। قُلْنَا (কুলনা – আমরা বললাম): لِمَنْ؟ (লিমান – কার জন্য?) قَالَ (কালা – তিনি বললেন): لِلَّهِ (লিল্লাহি – আল্লাহর জন্য), وَلِكِتَابِهِ (ওয়া লিকিতাবিহি – তাঁর কিতাবের জন্য), وَلِرَسُولِهِ (ওয়া লিরসুলিহি – তাঁর রাসুলের জন্য), وَلِأَئِمَّةِ الْمُسْلِمِينَ (ওয়া লিআয়িম্মাতিল মুসলিমিনা – মুসলিম নেতাদের জন্য) وَعَامَّتِهِمْ (ওয়া আম্মাতিহিম – এবং সর্বসাধারণের জন্য)।
পূর্ণাঙ্গ বঙ্গানুবাদ:
তামীম ইবনে আওস আদ-দারী (রা.) হতে বর্ণিত, নবী (সা.) বলেছেন: “দ্বীন হলো কল্যাণকামিতা বা আন্তরিকতা।” আমরা বললাম, “কার জন্য?” তিনি বললেন: “আল্লাহর জন্য, তাঁর কিতাবের জন্য, তাঁর রাসুলের জন্য, মুসলিম নেতাদের জন্য এবং সর্বসাধারণের জন্য।” (সহিহ মুসলিম)
হাদিস – ৮: মুসলিমের জান ও মালের পবিত্রতা
রাবী: আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা.)।
আরবি, উচ্চারণ ও শব্দার্থ:
عَنِ ابْنِ عُمَرَ (আনিবনি উমারা – ইবনে উমর হতে) أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ (আন্না রাসুলুল্লাহি – নিশ্চয়ই রাসুলুল্লাহ) ﷺ قَالَ (কালা – বলেছেন):
أُمِرْتُ أَنْ أُقَاتِلَ النَّاسَ (উমিরতু আন উকাতিলান নাসা – আমি মানুষের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য আদিষ্ট হয়েছি), حَتَّى يَشْهَدُوا (হাত্তা ইয়াশহাদু – যে পর্যন্ত না তারা সাক্ষ্য দেয়) أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ (আল-লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু – যে আল্লাহ ছাড়া সত্য কোনো ইলাহ নেই), وَأَنَّ مُحَمَّدًا رَسُولُ اللهِ (ওয়া আন্না মুহাম্মাদার রাসুলুল্লাহ – এবং মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসুল), وَيُقِيمُوا الصَّلَاةَ (ওয়া ইউকিমুস সালাতা – এবং তারা সালাত কায়েম করে), وَيُؤْتُوا الزَّكَاةَ (ওয়া ইউ’তুয যাকাআতা – এবং যাকাত আদায় করে)।
فَإِذَا فَعَلُوا ذَلِكَ (ফাইযা ফাআলু যালিকা – অতঃপর যখন তারা তা করবে), عَصَمُوا مِنِّي دِمَاءَهُمْ وَأَمْوَالَهُمْ (আসামু মিন্নি দিমাআহুম ওয়া আমওয়ালাহুম – তখন তারা আমার হাত থেকে তাদের জীবন ও সম্পদ নিরাপদ করে নেবে), إِلَّا بِحَقِّ الْإِسْلَامِ (ইল্লা বিহাক্কিল ইসলামি – তবে ইসলামের অধিকার ব্যতীত), وَحِسَابُهُمْ عَلَى اللَّهِ تَعَالَى (ওয়া হিসাবুহুম আলাল্লাহি তাআলা – আর তাদের হিসাব মহান আল্লাহর উপর)।
পূর্ণাঙ্গ বঙ্গানুবাদ:
ইবনে উমর (রা.) হতে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: “আমি মানুষের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য আদিষ্ট হয়েছি, যতক্ষণ না তারা এ সাক্ষ্য প্রদান করে যে আল্লাহ ছাড়া সত্য কোনো ইলাহ নেই এবং মুহাম্মাদ (সা.) আল্লাহর রাসুল, আর তারা সালাত কায়েম করে এবং যাকাত আদায় করে। যখন তারা এগুলো করবে, তখন তারা আমার হাত থেকে নিজেদের রক্ত (জীবন) ও সম্পদকে নিরাপদ করে নেবে—তবে ইসলামের অধিকার বা দণ্ডবিধির কারণ ব্যতীত। আর তাদের অভ্যন্তরীণ হিসাব-নিকাশ মহান আল্লাহর উপর ন্যস্ত।” (সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম)
হাদিস – ৯: সামর্থ্য অনুযায়ী দায়িত্ব পালন
রাবী: আবু হুরায়রা (রা.)।
আরবি, উচ্চারণ ও শব্দার্থ:
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ (আন আবি হুরাইরাতা – আবু হুরায়রা হতে) قَالَ (কালা – তিনি বলেন): سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ (সামি’তু রাসুলুল্লাহি – আমি রাসুলুল্লাহকে শুনেছি) ﷺ يَقُولُ (ইয়াকুলু – বলতে):
مَا نَهَيْتُكُمْ عَنْهُ (মা নাহাইতুকুম আনহু – আমি তোমাদেরকে যা কিছু থেকে নিষেধ করেছি), فَاجْتَنِبُوهُ (ফাজতানিবিহু – তোমরা তা বর্জন করো); وَمَا أَمَرْتُكُمْ بِهِ (ওয়া মা আমারতুকুম বিহি – আর যা কিছু নির্দেশ দিয়েছি), فَأْتُوا مِنْهُ مَا اسْتَطَعْتُمْ (ফা’তু মিনহু মাসতাতা’তুম – তার মধ্য থেকে সামর্থ্য অনুযায়ী পালন করো)। فَإِنَّمَا أَهْلَكَ الَّذِينَ مِنْ قَبْلِكُمْ (ফাইন্নামা আহলাকাল লাযিনা মিন কাবলিকুম – কেননা তোমাদের পূর্ববর্তীদের ধ্বংস করেছে) كَثْرَةُ مَسَائِلِهِمْ (কাসরাতু মাসায়িলিহিম – তাদের অতিরিক্ত প্রশ্ন) وَاخْتِلَافُهُمْ عَلَى أَنْبِيَائِهِمْ (ওয়াখতিলাফুহুম আলা আমবিয়ায়িহিম – এবং তাদের নবীদের সাথে মতবিরোধ)।
পূর্ণাঙ্গ বঙ্গানুবাদ:
আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে বলতে শুনেছি: “আমি তোমাদেরকে যা কিছু থেকে নিষেধ করেছি, তোমরা তা সম্পূর্ণ বর্জন করো। আর যা কিছু করার নির্দেশ দিয়েছি, তোমাদের সামর্থ্য অনুযায়ী তা পালন করো। কেননা তোমাদের পূর্ববর্তীদেরকে তাদের অতিরিক্ত প্রশ্নাবলি এবং তাদের নবীদের সাথে মতবিরোধ করাই ধ্বংস করে দিয়েছে।” (সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম)
হাদিস – ১০: আল্লাহ পবিত্র এবং তিনি পবিত্র বস্তুই গ্রহণ করেন
রাবী: আবু হুরায়রা (রা.)।
আরবি, উচ্চারণ ও শব্দার্থ:
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ (আন আবি হুরাইরাতা – আবু হুরায়রা হতে) قَالَ (কালা – তিনি বলেন): قَالَ رَسُولُ اللَّهِ (কালা রাসুলুল্লাহি – রাসুলুল্লাহ বলেছেন) ﷺ:
إِنَّ اللَّهَ تَعَالَى طَيِّبٌ (ইন্নাল্লাহা তাআলা তাইয়্যিবুন – নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ পবিত্র), لَا يَقْبَلُ إِلَّا طَيِّبًا (লা ইয়াকবালু ইল্লা তাইয়্যিবান – তিনি গ্রহণ করেন না পবিত্র বস্তু ছাড়া)।
وَإِنَّ اللَّهَ أَمَرَ الْمُؤْمِنِينَ (ওয়া ইন্নাল্লাহা আমারাল মুমিনিনা – আর নিশ্চয়ই আল্লাহ মুমিনদের নির্দেশ দিয়েছেন) بِمَا أَمَرَ بِهِ الْمُرْسَلِينَ (বিমা আমারা বিহিল মুরসালিনা – যা তিনি রাসুলদের নির্দেশ দিয়েছেন)।
فَقَالَ تَعَالَى (ফাকালা তাআলা – অতঃপর মহান আল্লাহ বলেন): {يَا أَيُّهَا الرُّسُلُ (ইয়া আইয়্যুহার রুসুলু – হে রাসুলগণ!) كُلُوا مِنَ الطَّيِّبَاتِ (কুলু মিনাত তাইয়্যিবাত – পবিত্র বস্তু হতে ভক্ষণ করো) وَاعْمَلُوا صَالِحًا (ওয়া’মালু সালিহান – এবং সৎ কাজ করো)},
وَقَالَ تَعَالَى (ওয়া কালা তাআলা – এবং মহান আল্লাহ বলেন): {يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا (ইয়া আইয়্যুহাল লাযিনা আমানু – হে ঈমানদারগণ!) كُلُوا مِنْ طَيِّبَاتِ مَا رَزَقْنَاكُمْ (কুলু মিন তাইয়্যিবাতি মা রাজাকনাকুম – পবিত্র বস্তু হতে ভক্ষণ করো যা আমরা রিযিক দিয়েছি)}।
ثُمَّ ذَكَرَ الرَّجُلَ (সুম্মা যাকারার রাজুলা – অতঃপর তিনি এমন ব্যক্তির কথা উল্লেখ করলেন) يُطِيلُ السَّفَرَ (ইউতিলুস সাফারা – যে দীর্ঘ সফর করে), أَشْعَثَ أَغْبَرَ (আশআসা আগবারা – চুল এলোমেলো ও ধুলোমলিন), يَمُدُّ يَدَيْهِ إِلَى السَّمَاءِ (ইয়ামুদ্দু ইয়াদাইহি ইলাস সামায়ি – আকাশের দিকে হাত প্রসারিত করে ডাকে): يَا رَبِّ يَا رَبِّ (ইয়া রাব্বি, ইয়া রাব্বি – হে আমার রব, হে আমার রব); وَمَطْعَمُهُ حَرَامٌ (ওয়া মাতআমুহু হারামুন – অথচ তার পানাহার হারাম), وَمَشْرَبُهُ حَرَامٌ (ওয়া মাশরাবুহু হারামুন – তার পানীয় হারাম), وَمَلْبَسُهُ حَرَامٌ (ওয়া মালবাসুহু হারামুন – তার পোশাক হারাম), وَغُذِّيَ بِالْحَرَامِ (ওয়া গুযযিয়া বিল হারামি – এবং তার দেহ হারাম দিয়ে পুষ্ট), فَأَنَّى يُسْتَجَابُ لِذَلِكَ (ফাআন্না ইউসতাজাবু লিযালিকা – তাহলে কীভাবে তার দোয়া কবুল হবে)?
পূর্ণাঙ্গ বঙ্গানুবাদ:
আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: “নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ পবিত্র, তিনি পবিত্র বস্তু ব্যতীত গ্রহণ করেন না। আর নিশ্চয়ই আল্লাহ রাসুলগণকে যে নির্দেশ দিয়েছেন, মুমিনদেরকেও সেই একই নির্দেশ দিয়েছেন। মহান আল্লাহ বলেন: ‘হে রাসুলগণ! তোমরা পবিত্র বস্তু থেকে আহার করো এবং সৎ কাজ করো।’ তিনি আরও বলেন: ‘হে ঈমানদারগণ! আমি তোমাদেরকে যেসব পবিত্র বস্তু রিযিক হিসেবে দিয়েছি, তা থেকে তোমরা আহার করো।’ এরপর নবীজি এমন এক ব্যক্তির কথা উল্লেখ করলেন, যে দীর্ঘ সফর করে, তার চুলগুলো এলোমেলো ও শরীর ধুলোমলিন। সে তার দুহাত আকাশের দিকে প্রসারিত করে ডাকতে থাকে: ‘হে আমার রব! হে আমার রব!’ অথচ তার খাদ্য হারাম, পানীয় হারাম, পোশাক হারাম এবং তার দেহ হারাম দ্বারাই পুষ্ট হয়েছে। এমতাবস্থায় কীভাবে তার দোয়া কবুল হতে পারে?” (সহিহ মুসলিম)
হাদিস – ১১: সন্দেহযুক্ত বিষয় ত্যাগ করা
রাবী: হাসান ইবনে আলী (রা.)।
আরবি, উচ্চারণ ও শব্দার্থ:
عَنِ الْحَسَنِ بْنِ عَلِيٍّ (আনিল হাসানি বনি আলিয়্যিন – হাসান ইবনে আলী হতে) سِبْطِ رَسُولِ اللَّهِ (সিবতি রাসুলিল্লাহি – রাসুলুল্লাহর দৌহিত্র) ﷺ قَالَ (কালা – তিনি বলেন):
حَفِظْتُ مِنْ رَسُولِ اللَّهِ (হাফিযতু মিন রাসুলিল্লাহি – আমি রাসুলুল্লাহ থেকে মুখস্থ রেখেছি) ﷺ: دَعْ مَا يُرِيبُكَ (দা’ মা ইউরিবুকা – ত্যাগ করো যা তোমাকে সন্দেহে ফেলে) إِلَى مَا لَا يُرِيبُكَ (ইলা মা লা ইউরিবুকা – ওই বিষয়ের দিকে যা তোমাকে সন্দেহে ফেলে না)।
পূর্ণাঙ্গ বঙ্গানুবাদ:
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর দৌহিত্র হাসান ইবনে আলী (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন: আমি রাসুলুল্লাহ (সা.) থেকে এ কথাটি মুখস্থ রেখেছি—”যা তোমাকে সন্দেহে ফেলে তা ত্যাগ করো এবং যা তোমাকে সন্দেহে ফেলে না তার দিকে ধাবিত হও।” (সুনান তিরমিজি ও নাসায়ি)
হাদিস – ১২: অনর্থক বিষয় পরিহার করা
রাবী: আবু হুরায়রা (রা.)।
আরবি, উচ্চারণ ও শব্দার্থ:
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ (আন আবি হুরাইরাতা – আবু হুরায়রা হতে) قَالَ (কালা – তিনি বলেন): قَالَ رَسُولُ اللَّهِ (কালা রাসুলুল্লাহি – রাসুলুল্লাহ বলেছেন) ﷺ:
مِنْ حُسْنِ إِسْلَامِ الْمَرْءِ (মিন হুসনি ইসলামিল মার’ই – কোনো ব্যক্তির ইসলামের অন্যতম সৌন্দর্য হলো) تَرْكُهُ مَا لَا يَعْنِيهِ (তারকুহু মা লা ইয়া’নিহি – তার অনর্থক বিষয় ত্যাগ করা)।
পূর্ণাঙ্গ বঙ্গানুবাদ:
আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: “কোনো ব্যক্তির ইসলামের অন্যতম সৌন্দর্য হলো—তার অনর্থক (যা তার দ্বীন ও দুনিয়ার কোনো উপকারে আসে না) কথা ও কাজ পরিহার করা।” (সুনান তিরমিজি ও ইবনে মাজাহ)
হাদিস – ১৩: নিজের জন্য যা পছন্দ, অন্যের জন্যও তা পছন্দ করা
রাবী: আনাস ইবনে মালিক (রা.)।
আরবি, উচ্চারণ ও শব্দার্থ:
عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ (আন আনাসি বনি মালিকিন – আনাস ইবনে মালিক হতে) عَنِ النَّبِيِّ (আনিন নাবিয়্যি – নবী হতে) ﷺ قَالَ (কালা – তিনি বলেছেন):
لَا يُؤْمِنُ أَحَدُكُمْ (লা ইউমিনু আহাদুকুম – তোমাদের কেউ পূর্ণ ঈমানদার হতে পারবে না) حَتَّى يُحِبَّ لِأَخِيهِ (হাত্তা ইউহিব্বা লিআখিহি – যে পর্যন্ত না সে তার ভাইয়ের জন্য ভালোবাসবে) مَا يُحِبُّ لِنَفْسِهِ (মা ইউহিব্বু লিনাফসিহি – যা সে নিজের জন্য ভালোবাসে)।
পূর্ণাঙ্গ বঙ্গানুবাদ:
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর খাদেম আনাস ইবনে মালিক (রা.) হতে বর্ণিত, নবী (সা.) বলেছেন: “তোমাদের কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গ মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না সে তার নিজের জন্য যা পছন্দ করে, তার মুসলিম ভাইয়ের জন্যও তা পছন্দ করে।” (সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম)
হাদিস – ১৪: মুসলিমের রক্তপাতের কারণ
রাবী: আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)।
আরবি, উচ্চারণ ও শব্দার্থ:
عَنِ ابْنِ مَسْعُودٍ (আনিবনি মাসউদ – ইবনে মাসউদ হতে) قَالَ (কালা – তিনি বলেন): قَالَ رَسُولُ اللَّهِ (কালা রাসুলুল্লাহি – রাসুলুল্লাহ বলেছেন) ﷺ:
لَا يَحِلُّ دَمُ امْرِئٍ مُسْلِمٍ (লা ইয়াহিললু দামু ইমরি’য়িন মুসলিমিন – কোনো মুসলিম ব্যক্তির রক্ত হালাল নয়) إِلَّا بِإِحْدَى ثَلَاثٍ (ইল্লা বিইহদা সালাসিন – তিনটি কারণের কোনো একটি ছাড়া): الثَّيِّبُ الزَّانِي (আসসায়্যিবুয যানি – বিবাহিত ব্যভিচারী), وَالنَّفْسُ بِالنَّفْسِ (ওয়ান নাফসু বিন নাফসি – এবং জীবনের বদলায় জীবন), وَالتَّارِكُ لِدِينِهِ الْمُفَارِقُ لِلْجَمَاعَةِ (ওয়াত তারিকু লিদিনিহিল মুফারিকু লিলজামাআতি – এবং যে দ্বীন ত্যাগকারী ও জামাত থেকে বিচ্ছিন্ন)।
পূর্ণাঙ্গ বঙ্গানুবাদ:
ইবনে মাসউদ (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: “এমন কোনো মুসলিম ব্যক্তি যে সাক্ষ্য দেয় আল্লাহ ছাড়া সত্য কোনো ইলাহ নেই এবং আমি আল্লাহর রাসুল—তার রক্তপাত করা তিনটি কারণের কোনো একটি ছাড়া হালাল নয়: ১. বিবাহিত হওয়ার পরও যে ব্যক্তি ব্যভিচারে লিপ্ত হয়, ২. জীবনের বদলায় জীবন (কিসাস), এবং ৩. যে ব্যক্তি তার দ্বীনকে ত্যাগ করে এবং মুসলিম সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।” (সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম)
হাদিস – ১৫: ভালো কথা বলা, প্রতিবেশী ও মেহমানকে সম্মান করা
রাবী: আবু হুরায়রা (রা.)।
আরবি, উচ্চারণ ও শব্দার্থ:
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ (আন আবি হুরাইরাতা – আবু হুরায়রা হতে) أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ (আন্না রাসুলুল্লাহি – নিশ্চয়ই রাসুলুল্লাহ) ﷺ قَالَ (কালা – বলেছেন):
مَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ (মান কানা ইউমিনু বিল্লাহি ওয়াল ইয়াওমিল আখিরি – যে ব্যক্তি আল্লাহ ও শেষ দিবসের প্রতি ঈমান রাখে) فَلْيَقُلْ خَيْرًا أَوْ لِيَصْمُتْ (ফালইয়াকুল খাইরান আও লিয়াসমুত – সে যেন ভালো কথা বলে অথবা চুপ থাকে), وَمَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ (ওয়া মান কানা ইউমিনু বিল্লাহি ওয়াল ইয়াওমিল আখিরি – আর যে ব্যক্তি আল্লাহ ও শেষ দিবসের প্রতি ঈমান রাখে) فَلْيُكْرِمْ جَارَهُ (ফালইউকরিম জারাহু – সে যেন তার প্রতিবেশীকে সম্মান করে), وَمَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ (ওয়া মান কানা ইউমিনু বিল্লাহি ওয়াল ইয়াওমিল আখিরি – এবং যে ব্যক্তি আল্লাহ ও শেষ দিবসের প্রতি ঈমান রাখে) فَلْيُكْرِمْ ضَيْفَهُ (ফালইউকরিম দাইফাহু – সে যেন তার মেহমানকে সম্মান করে)।
পূর্ণাঙ্গ বঙ্গানুবাদ:
আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: “যে ব্যক্তি আল্লাহ ও পরকালের প্রতি ঈমান রাখে, সে যেন ভালো কথা বলে অথবা চুপ থাকে। যে ব্যক্তি আল্লাহ ও পরকালের প্রতি ঈমান রাখে, সে যেন তার প্রতিবেশীকে সম্মান করে। এবং যে ব্যক্তি আল্লাহ ও পরকালের প্রতি ঈমান রাখে, সে যেন তার মেহমানকে সম্মান করে।” (সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম)
হাদিস – ১৬: রাগ পরিহার করা
রাবী: আবু হুরায়রা (রা.)।
আরবি, উচ্চারণ ও শব্দার্থ:
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ (আন আবি হুরাইরাতা – আবু হুরায়রা হতে) رَضِيَ اللهُ عَنْهُ، أَنَّ رَجُلًا (আন্না রাজুলান – নিশ্চয়ই এক ব্যক্তি) قَالَ لِلنَّبِيِّ (কালা লিননাবিয়্যি – নবীকে বলল) ﷺ: أَوْصِنِي (আওসিনি – আমাকে উপদেশ দিন)।
قَالَ (কালা – তিনি বললেন): لَا تَغْضَبْ (লা তাগদাব – রাগ করো না)। فَرَدَّدَ مِرَارًا (ফারুদ্দাদা মিরারান – অতঃপর লোকটি বারবার একই অনুরোধ করল), قَالَ (কালা – তিনি বললেন): لَا تَغْضَبْ (লা তাগদাব – রাগ করো না)।
পূর্ণাঙ্গ বঙ্গানুবাদ:
আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত, এক ব্যক্তি নবী (সা.)-কে বলল, “আমাকে কিছু উপদেশ দিন।” নবীজি (সা.) বললেন, “রাগ করো না।” লোকটি কয়েকবার একই অনুরোধ করল, নবীজি প্রত্যেকবারই বললেন, “রাগ করো না।” (সহিহ বুখারি)
হাদিস – ১৭: সকল কাজে ইহসান বা উত্তম আচরণ
রাবী: শাদ্দাদ ইবনে আওস (রা.)।
আরবি, উচ্চারণ ও শব্দার্থ:
عَنْ أَبِي يَعْلَى شَدَّادِ بْنِ أَوْسٍ (আন আবি ইয়া’লা শাদ্দাদি বনি আওসিন – আবু ইয়ালা শাদ্দাদ ইবনে আওস হতে) رَضِيَ اللهُ عَنْهُ، عَنْ رَسُولِ اللَّهِ (আন রাসুলিল্লাহি – রাসুলুল্লাহ হতে) ﷺ قَالَ (কালা – তিনি বলেছেন):
إِنَّ اللَّهَ (ইন্নাল্লাহা – নিশ্চয়ই আল্লাহ) كَتَبَ الْإِحْسَانَ (কাতাবাল ইহসানা – ইহসান বা উত্তম আচরণকে অবধারিত করেছেন) عَلَى كُلِّ شَيْءٍ (আলা কুল্লি শাইয়িন – প্রত্যেক বিষয়ের উপর)।
فَإِذَا قَتَلْتُمْ (ফাইযা কাতালতুম – সুতরাং যখন তোমরা হত্যা করবে) فَأَحْسِنُوا الْقِتْلَةَ (ফাআহসিনুল কিতলাতা – তখন উত্তমভাবে হত্যা করো), وَإِذَا ذَبَحْتُمْ (ওয়া ইযা যাবাহ্তুম – আর যখন তোমরা জবাই করবে) فَأَحْسِنُوا الذِّبْحَةَ (ফাআহসিনুয যিবহাতা – তখন উত্তমভাবে জবাই করো)। وَلْيُرِحْ (ওয়ালইউরিহ – আর সে যেন আরাম দেয়) ذَبِيحَتَهُ (যাবিহুতাহু – তার জবেহকৃত পশুকে)।
পূর্ণাঙ্গ বঙ্গানুবাদ:
আবু ইয়ালা শাদ্দাদ ইবনে আওস (রা.) হতে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: “নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা প্রত্যেক বিষয়ের ক্ষেত্রে ইহসান (উত্তম ও দয়াশীল আচরণ) করা অবধারিত করেছেন। অতএব যখন তোমরা (হত্যার নির্দেশপ্রাপ্ত কাউকে) হত্যা করবে, তখন উত্তম পদ্ধতিতে হত্যা করো। আর যখন তোমরা কোনো পশু জবাই করবে, তখন উত্তম পদ্ধতিতে জবাই করো। তোমাদের প্রত্যেকেই যেন তার ছুরি ধারালো করে নেয় এবং জবাইকৃত পশুকে আরাম দেয়।” (সহিহ মুসলিম)
হাদিস – ১৮: তাকওয়া ও উত্তম চরিত্র
রাবী: আবু যর এবং মুআয ইবনে জাবাল (রা.)।
আরবি, উচ্চারণ ও শব্দার্থ:
عَنْ أَبِي ذَرٍّ جُنْدُبِ بْنِ جُنَادَةَ (আন আবি যাররিন জুনদুবি বনি জুনাদাতা – আবু যর জুনদুব ইবনে জুনাদাহ হতে), وَأَبِي عَبْدِ الرَّحْمَنِ مُعَاذِ بْنِ جَبَلٍ (ওয়া আবি আবদির রহমানি মুআযি বনি জাবালিন – এবং আবু আব্দুর রহমান মুআয ইবনে জাবাল হতে) رَضِيَ اللهُ عَنْهُمَا، عَنْ رَسُولِ اللَّهِ (আন রাসুলিল্লাহি – রাসুলুল্লাহ হতে) ﷺ قَالَ (কালা – তিনি বলেছেন):
اتَّقِ اللَّهَ (ইত্তাকিল্লাহ – আল্লাহকে ভয় করো) حَيْثُمَا كُنْتَ (হাইসুমা কুনতা – যেখানেই তুমি থাকো না কেন), وَأَتْبِعِ السَّيِّئَةَ الْحَسَنَةَ (ওয়া আতবিয়িস সাইয়্যিআতাল হাসানাতা – এবং মন্দ কাজের পেছনে ভালো কাজ করো) تَمْحُهَا (তামহুহা – তা ওই মন্দ কাজকে মিটিয়ে দেবে), وَخَالِقِ النَّاسَ (ওয়া খালিকিন নাসা – এবং মানুষের সাথে আচরণ করো) بِخُلُقٍ حَسَنٍ (বিখুলুকিন হাসানিন – উত্তম চরিত্রে)।
পূর্ণাঙ্গ বঙ্গানুবাদ:
আবু যর জুনদুব ইবনে জুনাদাহ এবং আবু আব্দুর রহমান মুআয ইবনে জাবাল (রা.) হতে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: “তুমি যেখানেই থাকো না কেন, আল্লাহকে ভয় করো। কোনো মন্দ কাজ হয়ে গেলে সাথে সাথে একটি ভালো কাজ করো, যা ওই মন্দ কাজটিকে মিটিয়ে দেবে। আর মানুষের সাথে উত্তম আচরণ করো।” (সুনান তিরমিজি)
হাদিস – ১৯: আল্লাহর প্রতি অবিচল বিশ্বাস ও ভরসা
রাবী: আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.)।
আরবি, উচ্চারণ ও শব্দার্থ:
عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عَبَّاسٍ (আন আবদিল্লাহি বনি আব্বাসিন – আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস হতে) رَضِيَ اللهُ عَنْهُمَا قَالَ (কালা – তিনি বলেন): كُنْتُ خَلْفَ النَّبِيِّ (কুনতু খালফান নাবিয়্যি – একদিন আমি নবীজির পেছনে ছিলাম) ﷺ يَوْمًا (ইয়াওমান – একদিন), فَقَالَ (ফাকালা – অতঃপর তিনি বললেন): يَا غُلَامُ (ইয়া গুলামু – হে বালক)! إِنِّي أُعَلِّمُكَ كَلِمَاتٍ (ইন্নি উআল্লিমুকা কালিমাতিন – নিশ্চয়ই আমি তোমাকে কয়েকটি কথা শেখাব):
احْفَظِ اللَّهَ (ইহফাযিল্লাহ – আল্লাহর বিধান রক্ষা করো) يَحْفَظْكَ (ইয়াহফাযকা – তিনি তোমাকে রক্ষা করবেন)। احْفَظِ اللَّهَ تَجِدْهُ تُجَاهَكَ (ইহফাযিল্লাহ তাজিদহু তুজাহাকা – আল্লাহর বিধান রক্ষা করো, তুমি তাঁকে তোমার সামনে পাবে)। إِذَا سَأَلْتَ (ইযা সাআলতা – যখন তুমি চাইবে) فَاسْأَلِ اللَّهَ (ফাসআলিল্লাহ – আল্লাহর কাছেই চাও), وَإِذَا اسْتَعَنْتَ (ওয়া ইযাসতাআনতা – আর যখন তুমি সাহায্য চাইবে) فَاسْتَعِنْ بِاللَّهِ (ফাসতায়িন বিল্লাহ – আল্লাহর কাছেই সাহায্য চাও)।
وَاعْلَمْ أَنَّ الْأُمَّةَ (ওয়া’লাম আন্নাল উম্মাতা – আর জেনে রাখো গোটা জাতি) لَوِ اجْتَمَعَتْ عَلَى أَنْ يَنْفَعُوكَ بِشَيْءٍ (লাউয়িজতামাআত আলা আন ইয়ানফাউকা বিশাইয়িন – যদি তোমার কোনো উপকার করার জন্য একত্রিত হয়), لَمْ يَنْفَعُوكَ إِلَّا بِشَيْءٍ (লাম ইয়ানফাউকা ইল্লা বিশাইয়িন – তারা কোনো উপকার করতে পারবে না কেবল ততটুকুই ছাড়া) قَدْ كَتَبَهُ اللَّهُ لَكَ (কাদ কাতাবাহুল্লাহু লাকা – যা আল্লাহ তোমার জন্য লিখে রেখেছেন)।
وَإِنِ اجْتَمَعُوا عَلَى أَنْ يَضُرُّوكَ بِشَيْءٍ (ওয়া ইনিজতামাউ আলা আন ইয়াদুরুকা বিশাইয়িন – আর যদি তারা তোমার ক্ষতি করার জন্য একত্রিত হয়), لَمْ يَضُرُّوكَ إِلَّا بِشَيْءٍ (লাম ইয়াদুরুকা ইল্লা বিশাইয়িন – তারা ক্ষতি করতে পারবে না কেবল ততটুকুই ছাড়া) قَدْ كَتَبَهُ اللَّهُ عَلَيْكَ (কাদ কাতাবাহুল্লাহু আলাইকা – যা আল্লাহ তোমার বিপক্ষে লিখে রেখেছেন)। رُفِعَتِ الْأَقْلَامُ (রুফিআতি আলামু – কলমসমূহ তুলে নেওয়া হয়েছে) وَجَفَّتِ الصُّحُفُ (ওয়া জাফফাতিস সুহুফু – এবং পৃষ্ঠাসমূহ শুকিয়ে গেছে)।
পূর্ণাঙ্গ বঙ্গানুবাদ:
আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন: একদিন আমি নবী (সা.)-এর পেছনে ছিলাম। তখন তিনি আমাকে বললেন, “হে বালক! আমি তোমাকে কয়েকটি কথা শেখাচ্ছি—তুমি আল্লাহর (বিধানের) হিফাজত করো, আল্লাহ তোমার হিফাজত করবেন। তুমি আল্লাহর (বিধানের) হিফাজত করো, তুমি তাঁকে তোমার সামনে (সাহায্যকারী হিসেবে) পাবে। যখন কিছু চাইবে, কেবল আল্লাহর কাছেই চাইবে। আর যখন সাহায্য প্রার্থনা করবে, কেবল আল্লাহর কাছেই সাহায্য প্রার্থনা করবে। জেনে রাখো, গোটা জাতিও যদি তোমার কোনো উপকার করার জন্য একত্রিত হয়, তবে আল্লাহ তোমার তাকদিরে যতটুকু লিখে রেখেছেন, তার বাইরে তারা কোনো উপকার করতে পারবে না। আর তারা সবাই মিলেও যদি তোমার কোনো ক্ষতি করার জন্য একত্রিত হয়, তবে আল্লাহ তোমার তাকদিরে যা লিখে রেখেছেন, তার বাইরে তারা বিন্দুমাত্র ক্ষতি করতে পারবে না। তাকদির লেখার কলম উঠিয়ে নেওয়া হয়েছে এবং এর পৃষ্ঠাসমূহ শুকিয়ে গেছে।” (সুনান তিরমিজি)
হাদিস – ২০: লজ্জাশীলতা
রাবী: আবু মাসউদ আল-আনসারি (রা.)।
আরবি, উচ্চারণ ও শব্দার্থ:
عَنْ أَبِي مَسْعُودٍ عُقْبَةَ بْنِ عَمْرٍو الْأَنْصَارِيِّ (আন আবি মাসউদিন উকবা বনি আমরিন আল-আনসারিয়্যি – আবু মাসউদ উকবা ইবনে আমর আল-আনসারি হতে) قَالَ (কালা – তিনি বলেন): قَالَ رَسُولُ اللَّهِ (কালা রাসুলুল্লাহি – রাসুলুল্লাহ বলেছেন) ﷺ:
إِنَّ مِمَّا أَدْرَكَ النَّاسُ (ইন্না মিম্মা আদরাকান নাসু – নিশ্চয়ই মানুষ যা কিছু পেয়েছে) مِنْ كَلَامِ النُّبُوَّةِ الْأُولَى (মিন কালামিন নুবুওয়াতিল উলা – পূর্ববর্তী নবুওয়াতের কথার মধ্য হতে তা হলো): إِذَا لَمْ تَسْتَحِ (ইযা লাম তাসতাহি – যখন তুমি লজ্জা না পাও) فَاصْنَعْ مَا شِئْتَ (ফাসনা’ মা শি’তা – তবে তুমি করো যা তুমি চাও)।
পূর্ণাঙ্গ বঙ্গানুবাদ:
আবু মাসউদ বদরি (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: “পূর্ববর্তী নবীদের যেসব বাণী মানুষের কাছে পৌঁছেছে, তার মধ্যে একটি হলো—’যখন তোমার মাঝে লজ্জাই না থাকবে, তখন তুমি যা ইচ্ছা তা-ই করতে পারো।'” (সহিহ বুখারি)
হাদিস – ২১: ঈমান ও ইস্তিকামাত (দৃঢ়তা)
রাবী: সুফিয়ান ইবনে আব্দুল্লাহ আস-সাকাফি (রা.)।
আরবি, উচ্চারণ ও শব্দার্থ:
عَنْ سُفْيَانَ بْنِ عَبْدِ اللَّهِ الثَّقَفِيِّ (আন সুফিয়ানা বনি আবদিল্লাহিস সাকাফিয়্যি – সুফিয়ান ইবনে আব্দুল্লাহ আস-সাকাফি হতে) قَالَ (কালা – তিনি বলেন): قُلْتُ (কুলতু – আমি বললাম): يَا رَسُولَ اللَّهِ (ইয়া রাসুলুল্লাহ – হে আল্লাহর রাসুল)! قُلْ لِي (কুল লি – আমাকে বলে দিন) فِي الْإِسْلَامِ (ফিল ইসলামি – ইসলামের ব্যাপারে) قَوْلًا (কাওলান – এমন একটি কথা) لَا أَسْأَلُ عَنْهُ أَحَدًا غَيْرَكَ (লা আসআলু আনহু আহাদান গাইরাকা – যা আমি আপনি ছাড়া অন্য কাউকে জিজ্ঞেস করব না)।
قَالَ (কালা – তিনি বললেন): قُلْ (কুল – বলো): آمَنْتُ بِاللَّهِ (আমানতু বিল্লাহি – আমি আল্লাহর প্রতি ঈমান আনলাম), ثُمَّ اسْتَقِمْ (সুম্মাসতাকিম – অতঃপর এর উপর অটল থাকো)।
পূর্ণাঙ্গ বঙ্গানুবাদ:
সুফিয়ান ইবনে আব্দুল্লাহ আস-সাকাফি (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন: আমি বললাম, “হে আল্লাহর রাসুল! আমাকে ইসলাম সম্পর্কে এমন একটি কথা বলে দিন, যা আপনার পর আমি আর কাউকেও জিজ্ঞেস করব না।” তিনি বললেন: “তুমি বলো, আমি আল্লাহর প্রতি ঈমান আনলাম। অতঃপর এই কথার উপর অবিচল ও দৃঢ় থাকো।” (সহিহ মুসলিম)
হাদিস – ২২: জান্নাতে যাওয়ার সহজ উপায়
রাবী: জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ (রা.)।
আরবি, উচ্চারণ ও শব্দার্থ:
عَنْ جَابِرِ بْنِ عَبْدِ اللَّهِ الْأَنْصَارِيِّ (আন জাবীরি বনি আবদিল্লাহিল আনসারিয়্যি – জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ আল-আনসারি হতে) أَنَّ رَجُلًا سَأَلَ رَسُولَ اللَّهِ (আন্না রাজুলান সাআলা রাসুলুল্লাহি – নিশ্চয়ই এক ব্যক্তি রাসুলুল্লাহকে জিজ্ঞেস করল) ﷺ فَقَالَ (ফাকালা – অতঃপর সে বলল):
أَرَأَيْتَ (আরাইতা – আপনি কি মনে করেন) إِذَا صَلَّيْتُ الْمَكْتُوبَاتِ (ইযা সাল্লাইতুল মাকতুবাত – যদি আমি ফরজ সালাত আদায় করি), وَصُمْتُ رَمَضَانَ (ওয়া সুমতু রমাদানা – এবং রমজানের রোজা রাখি), وَأَحْلَلْتُ الْحَلَالَ (ওয়া আহলালতুল হালালা – এবং হালালকে হালাল জানি), وَحَرَّمْتُ الْحَرَامَ (ওয়া হাররামতুল হারামা – এবং হারামকে হারাম জানি), وَلَمْ أَزِدْ عَلَى ذَلِكَ شَيْئًا (ওয়া লাম আযিদ আলা যালিকা শাইয়ান – এবং এর উপর কোনো কিছু বৃদ্ধি না করি), أَأَدْخُلُ الْجَنَّةَ؟ (আআদখুলুল জান্নাতা – আমি কি জান্নাতে প্রবেশ করব?) قَالَ (কালা – তিনি বললেন): نَعَمْ (নাআম – হ্যাঁ)।
পূর্ণাঙ্গ বঙ্গানুবাদ:
জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ আল-আনসারি (রা.) হতে বর্ণিত, এক ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে প্রশ্ন করে বলল: “আপনি কি মনে করেন, আমি যদি কেবল ফরজ সালাতগুলো আদায় করি, রমজান মাসের রোজা রাখি, হালালকে হালাল হিসেবে মেনে নিই এবং হারামকে হারাম হিসেবে বর্জন করি—আর এর অতিরিক্ত কোনো ইবাদত না করি, তবে কি আমি জান্নাতে প্রবেশ করতে পারব?” নবীজি (সা.) বললেন: “হ্যাঁ।” (সহিহ মুসলিম)
হাদিস – ২৩: পবিত্রতা ও ইবাদতের গুরুত্ব
রাবী: আবু মালিক আল-আশআরি (রা.)।
আরবি, উচ্চারণ ও শব্দার্থ:
عَنْ أَبِي مَالِكٍ الْأَشْعَرِيِّ (আন আবি মালিকিন আল-আশআরিয়্যি – আবু মালিক আল-আশআরি হতে) قَالَ (কালা – তিনি বলেন): قَالَ رَسُولُ اللَّهِ (কালা রাসুলুল্লাহি – রাসুলুল্লাহ বলেছেন) ﷺ:
الطُّهُورُ شَطْرُ الْإِيمَانِ (আত-তুহুরু শাতরুল ঈমানি – পবিত্রতা ঈমানের অর্ধেক), وَالْحَمْدُ لِلَّهِ تَمْلَأُ الْمِيزَانَ (ওয়ালহামদুলিল্লাহি তামলাউল মিযানা – এবং আলহামদুলিল্লাহ পাল্লাকে পূর্ণ করে দেয়)। وَسُبْحَانَ اللَّهِ وَالْحَمْدُ لِلَّهِ (ওয়া সুবহানাল্লাহি ওয়ালহামদুলিল্লাহি – এবং সুবহানাল্লাহ ও আলহামদুলিল্লাহ) تَمْلَآَنِ مَا بَيْنَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ (তামলায়ানি মা বাইনাস সামাওয়াতি ওয়াল আরদি – আসমানসমূহ ও জমিনের মাঝখানের শূন্যস্থান পূর্ণ করে দেয়)।
وَالصَّلَاةُ نُورٌ (ওয়াস সালাতু নুরুন – আর সালাত হলো আলো), وَالصَّدَقَةُ بُرْهَانٌ (ওয়াস সাদাকাতু বুরহানুন – আর সদকা হলো প্রমাণ), وَالصَّبْرُ ضِيَاءٌ (ওয়াস সাবরু দিয়াউন – আর ধৈর্য হলো জ্যোতি)। وَالْقُرْآنُ حُجَّةٌ لَكَ أَوْ عَلَيْكَ (ওয়ালকুরআনু হুজ্জাতুন লাকা আও আলাইকা – আর কুরআন হলো তোমার পক্ষে অথবা বিপক্ষে দলিল)।
كُلُّ النَّاسِ يَغْدُو (কুল্লুন নাসি ইয়াগদু – সব মানুষই ভোরে বের হয়), فَبَائِعٌ نَفْسَهُ (ফাবায়িউন নাফসাহু – অতঃপর নিজেকে বিক্রি করে), فَأُعْتِقُهَا أَوْ مُوبِقُهَا (ফাআউতিকুহা আও মুবিকুহা – অতঃপর সে নিজেকে মুক্ত করে অথবা ধ্বংস করে)।
পূর্ণাঙ্গ বঙ্গানুবাদ:
আবু মালিক আল-আশআরি (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: “পবিত্রতা ঈমানের অর্ধেক। ‘আলহামদুলিল্লাহ’ নেকির পাল্লাকে পূর্ণ করে দেয়। ‘সুবহানাল্লাহ’ এবং ‘আলহামদুলিল্লাহ’ আসমান ও জমিনের মধ্যবর্তী শূন্যস্থানকে সওয়াব দিয়ে পূর্ণ করে দেয়। সালাত হলো আলো, সদকা বা দান হলো (ঈমানের) সুস্পষ্ট প্রমাণ এবং ধৈর্য হলো প্রজ্জ্বলিত জ্যোতি। আর কুরআন হলো তোমার পক্ষে অথবা তোমার বিপক্ষে অকাট্য দলিল। প্রত্যেক মানুষই ভোরে নিজ নিজ কাজে বের হয় এবং নিজের সত্তাকে বিক্রি করে; অতঃপর সে হয় তাকে জাহান্নাম থেকে মুক্ত করে, নতুবা নিজেকে ধ্বংস করে দেয়।” (সহিহ মুসলিম)
হাদিস – ২৪: জুলুম বা অবিচার হারাম
রাবী: আবু যর আল-গিফারি (রা.)।
আরবি, উচ্চারণ ও শব্দার্থ (সংক্ষিপ্ত):
عَنْ أَبِي ذَرٍّ الْغِفَارِيِّ (আন আবি যাররিন আল-গিফারিয়্যি – আবু যর আল-গিফারি হতে) عَنِ النَّبِيِّ (আনিন নাবিয়্যি – নবী হতে) ﷺ فِيمَا يَرْوِيهِ عَنْ رَبِّهِ عَزَّ وَجَلَّ (ফিমা ইয়ারউয়িহি আন রাব্বিহি আয্যা ওয়া জাল্লা – যা তিনি বর্ণনা করেন তাঁর রবের পক্ষ হতে) أَنَّهُ قَالَ (আন্নাহু কালা – যে তিনি বলেছেন):
يَا عِبَادِي (ইয়া ইবাদি – হে আমার বান্দাগণ!) إِنِّي حَرَّمْتُ الظُّلْمَ (ইন্নি হাররামতুয যুলমা – নিশ্চয়ই আমি জুলুমকে হারাম করেছি) عَلَى نَفْسِي (আলা নাফসি – আমার নিজের উপর), وَجَعَلْتُهُ بَيْنَكُمْ مُحَرَّمًا (ওয়া জাআলতুহু বাইনাকুম মুহাররামান – এবং আমি একে তোমাদের মাঝেও হারাম করেছি), فَلَا تَظَالَمُوا (ফালা তাযালামু – অতএব তোমরা একে অপরের উপর জুলুম করো না)…
পূর্ণাঙ্গ বঙ্গানুবাদ:
আবু যর আল-গিফারি (রা.) হতে বর্ণিত, নবী (সা.) তাঁর রবের পক্ষ থেকে হাদিসে কুদসিতে বর্ণনা করেন। মহান আল্লাহ বলেছেন:
“হে আমার বান্দাগণ! আমি আমার নিজের উপর জুলুমকে হারাম করেছি এবং তোমাদের পরস্পরের মধ্যেও একে হারাম করেছি। অতএব তোমরা একে অপরের উপর জুলুম করো না।
হে আমার বান্দাগণ! আমি যাকে পথ দেখিয়েছি সে ছাড়া তোমরা সবাই পথভ্রষ্ট; অতএব তোমরা আমার কাছে হিদায়াত চাও, আমি তোমাদের হিদায়াত দেব…
হে আমার বান্দাগণ! এগুলো কেবল তোমাদেরই আমল, যা আমি তোমাদের জন্য হিসাব করে রাখি। অতঃপর আমি এর পূর্ণ প্রতিফল তোমাদেরকে দেব। সুতরাং যে ব্যক্তি কল্যাণ পাবে, সে যেন আল্লাহর প্রশংসা করে। আর যে অন্য কিছু পাবে, সে যেন নিজেকে ছাড়া অন্য কাউকে তিরস্কার না করে।” (সহিহ মুসলিম)
হাদিস – ২৫: ধনি-দরিদ্র ও বিবিধ নেক আমল
রাবী: আবু যর আল-গিফারি (রা.)।
আরবি, উচ্চারণ ও শব্দার্থ:
عَنْ أَبِي ذَرٍّ (আন আবি যাররিন – আবু যর হতে) أَنَّ أُنَاسًا (আন্না উনাসান – নিশ্চয়ই কিছু মানুষ) قَالُوا لِلنَّبِيِّ (কালু লিননাবিয়্যি – নবীকে বললেন): يَا رَسُولَ اللَّهِ (ইয়া রাসুলুল্লাহ – হে আল্লাহর রাসুল!) ذَهَبَ أَهْلُ الدُّثُورِ بِالْأُجُورِ (যাহাবা আহলুদ দুসুরি বিল উজুরি – বিত্তবানেরা সকল সওয়াব নিয়ে গেল)। يُصَلُّونَ كَمَا نُصَلِّي (ইউসাল্লুনা কামা নুসাল্লি – তারা সালাত আদায় করে যেমন আমরা করি), وَيَصُومُونَ كَمَا نَصُومُ (ওয়া ইয়াসুমুনা কামা নাসুমু – তারা রোজা রাখে যেমন আমরা রাখি), وَيَتَصَدَّقُونَ (ওয়া ইয়াতাসাদদাকুনা – এবং তারা দান-সদকা করে) بِفُضُولِ أَمْوَالِهِمْ (বিফুদুলি আমওয়ালিহিম – তাদের অতিরিক্ত সম্পদ থেকে)।
قَالَ (কালা – তিনি বললেন): أَوَلَيْسَ قَدْ جَعَلَ اللَّهُ لَكُمْ مَا تَصَّدَّقُونَ؟ (আওয়ালাইসা কাদ জাআলাল্লাহু লাকুম মা তাসসাদ্দাকুন – আল্লাহ কি তোমাদের জন্য এমন কিছু করে দেননি যা দিয়ে তোমরা সদকা করতে পারো?) إِنَّ بِكُلِّ تَسْبِيحَةٍ صَدَقَةً (ইন্না বিকুল্লি তাসবিহাতিন সাদাকাতান – নিশ্চয়ই প্রতিটি সুবহানাল্লাহ বলা একটি সদকা)… وَفِي بُضْعِ أَحَدِكُمْ صَدَقَةٌ (ওয়া ফি বুদয়ি আহাদিকুম সাদাকাতুন – এবং তোমাদের কারো স্ত্রীর সাথে মিলনেও সদকা রয়েছে)।
পূর্ণাঙ্গ বঙ্গানুবাদ:
আবু যর (রা.) হতে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কিছু (দরিদ্র) সাহাবী নবীজিকে বললেন, “হে আল্লাহর রাসুল! বিত্তবান বা ধনী লোকেরা তো সব সওয়াব নিয়ে গেল। আমরা যেমন সালাত আদায় করি, তারাও তেমনি সালাত আদায় করে। তদুপরি তারা তাদের অতিরিক্ত সম্পদ থেকে দান-সদকাও করে।” নবীজি (সা.) বললেন, “আল্লাহ কি তোমাদের জন্য এমন কিছু দেননি, যার মাধ্যমে তোমরাও সদকা করতে পারো? নিশ্চয়ই প্রতিটি ‘সুবহানাল্লাহ’ বলা একটি সদকা, প্রতিটি ‘আল্লাহু আকবার’ বলা সদকা, প্রতিটি ‘আলহামদুলিল্লাহ’ বলা সদকা, প্রতিটি ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বলা সদকা। সৎকাজের আদেশ দেওয়া সদকা এবং অসৎকাজ থেকে নিষেধ করা সদকা। এমনকি তোমাদের স্ত্রীর সাথে দৈহিক মিলনেও সদকা (সওয়াব) রয়েছে।” (সহিহ মুসলিম)
হাদিস – २৬: শরীরের প্রতিটি জোড়ার জন্য সদকা
রাবী: আবু হুরায়রা (রা.)।
আরবি, উচ্চারণ ও শব্দার্থ:
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ (আন আবি হুরাইরাতা – আবু হুরায়রা হতে) قَالَ (কালা – তিনি বলেন): قَالَ رَسُولُ اللَّهِ (কালা রাসুলুল্লাহি – রাসুলুল্লাহ বলেছেন) ﷺ:
كُلُّ سُلَامَى مِنَ النَّاسِ عَلَيْهِ صَدَقَةٌ (কুল্লু সুলামা মিনান নাসি আলাইহি সাদাকাতুন – মানুষের শরীরের প্রত্যেক জোড়ার উপর একটি সদকা রয়েছে) كُلَّ يَوْمٍ تَطْلُعُ فِيهِ الشَّمْسُ (কুল্লা ইয়াওমিন তাতলুউ ফিহিশ শামসু – প্রতিদিন যাতে সূর্য উদিত হয়): تَعْدِلُ بَيْنَ الِاثْنَيْنِ صَدَقَةٌ (তা’দিলু বাইনাল ইসনাইন সাদাকাতুন – তুমি দুজনের মাঝে ইনসাফ করবে তাও সদকা)… وَتُمِيطُ الْأَذَى عَنِ الطَّرِيقِ صَدَقَةٌ (ওয়া তুমিতুল আযা আনিত তরিকি সাদাকাতুন – আর তুমি পথ থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরিয়ে দেবে তাও সদকা)।
পূর্ণাঙ্গ বঙ্গানুবাদ:
আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: “মানুষের শরীরের প্রতিটি জোড়া বা গ্রন্থির উপর প্রতিদিন—যেদিন সূর্য উদিত হয়—সদকা দেওয়া ওয়াজিব। দুজন মানুষের মাঝে ন্যায়বিচার করে মীমাংসা করে দেওয়া একটি সদকা। কোনো মানুষকে তার বাহনে উঠতে সাহায্য করা বা তার মালপত্র বাহনে তুলে দেওয়া একটি সদকা। ভালো কথা বলা একটি সদকা। সালাতের উদ্দেশ্যে মসজিদের দিকে প্রতিটি পদক্ষেপ একটি সদকা। আর রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু (যেমন- কাঁটা, পাথর) সরিয়ে দেওয়াও একটি সদকা।” (সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম)
হাদিস – ২৭: পুণ্য ও পাপের পরিচয়
রাবী: নাওয়াস ইবনে সামআন ও ওয়াবিসাহ ইবনে মাবাদ (রা.)।
আরবি, উচ্চারণ ও শব্দার্থ:
عَنِ النَّوَّاسِ بْنِ سِمْعَانَ (আনিন নাওয়াসি বনি সামআনা – নাওয়াস ইবনে সামআন হতে) عَنِ النَّبِيِّ (আনিন নাবিয়্যি – নবী হতে) ﷺ قَالَ (কালা – তিনি বলেছেন):
الْبِرُّ حُسْنُ الْخُلُقِ (আল-বিররু হুসনুল খুলুকি – পুণ্য হলো উত্তম চরিত্র), وَالْإِثْمُ مَا حَاكَ فِي نَفْسِكَ (ওয়াল ইসমু মা হাকা ফি নাফসিকা – আর পাপ হলো যা তোমার অন্তরে খটকা সৃষ্টি করে) وَكَرِهْتَ أَنْ يَطَّلِعَ عَلَيْهِ النَّاسُ (ওয়া কারিহতা আন ইয়াত্তালিআ আলাইহিন নাসু – এবং তুমি অপছন্দ করো যে মানুষ তা জেনে যাক)।
وَعَنْ وَابِصَةَ بْنِ مَعْبَدٍ (ওয়া আন ওয়াবিসাতা বনি মা’বাদিন – এবং ওয়াবিসাহ ইবনে মাবাদ হতে)… اسْتَفْتِ قَلْبَكَ (ইসতাফতি কালবাকা – তোমার অন্তরকে ফতোয়া জিজ্ঞেস করো)।
পূর্ণাঙ্গ বঙ্গানুবাদ:
নাওয়াস ইবনে সামআন (রা.) হতে বর্ণিত, নবী (সা.) বলেছেন: “পুণ্য হলো উত্তম চরিত্র। আর পাপ হলো তা-ই, যা তোমার অন্তরে খটকা সৃষ্টি করে এবং তুমি অপছন্দ করো যে মানুষ তা জেনে ফেলুক।” (সহিহ মুসলিম)
ওয়াবিসাহ ইবনে মাবাদ (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নিকট এলাম। তিনি বললেন, “তুমি কি পুণ্য সম্পর্কে জিজ্ঞেস করতে এসেছ?” আমি বললাম, “হ্যাঁ।” তিনি বললেন, “তোমার নিজ অন্তরকে ফতোয়া জিজ্ঞেস করো। পুণ্য হলো তা-ই, যাতে আত্মা প্রশান্তি পায় এবং অন্তর তৃপ্ত হয়। আর পাপ হলো তা-ই, যা অন্তরে খটকা সৃষ্টি করে…।” (মুসনাদ আহমাদ ও দারেমি)
হাদিস – ২৮: সুন্নাহর অনুসরণ এবং বিদআত বর্জন
রাবী: ইরবাদ ইবনে সারিয়া (রা.)।
আরবি, উচ্চারণ ও শব্দার্থ:
عَنِ الْعِرْبَاضِ بْنِ سَارِيَةَ (আনিল ইরবাদি বনি সারিয়াতা – ইরবাদ ইবনে সারিয়া হতে) قَالَ (কালা – তিনি বলেন): وَعَظَنَا رَسُولُ اللَّهِ (ওয়াআযানা রাসুলুল্লাহি – রাসুলুল্লাহ আমাদের ওয়াজ করলেন) ﷺ مَوْعِظَةً وَجِلَتْ مِنْهَا الْقُلُوبُ (মাওয়িযাতান ওয়াজিলাত মিনহাল কুলুবু – এমন এক ওয়াজ যাতে অন্তরসমূহ ভীত হয়ে গেল) وَذَرَفَتْ مِنْهَا الْعُيُونُ (ওয়া যারাফাত মিনহাল উয়ুনু – এবং চোখ থেকে অশ্রু প্রবাহিত হলো)…
فَعَلَيْكُمْ بِسُنَّتِي وَسُنَّةِ الْخُلَفَاءِ الرَّاشِدِينَ (ফাআলাইকুম বিসুন্নতি ওয়া সুন্নাতিল খুলাফায়ির রাশিদিনা – সুতরাং তোমাদের উপর অপরিহার্য হলো আমার সুন্নাহ এবং খুলাফায়ে রাশিদীনের সুন্নাহ)…
পূর্ণাঙ্গ বঙ্গানুবাদ:
ইরবাদ ইবনে সারিয়া (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন: “রাসুলুল্লাহ (সা.) একদিন আমাদেরকে এমন হৃদয়স্পর্শী ওয়াজ করলেন যে, তাতে আমাদের অন্তর ভীত-সন্ত্রস্ত হলো এবং চোখ থেকে অশ্রু প্রবাহিত হলো। আমরা বললাম, ‘হে আল্লাহর রাসুল! এটি যেন বিদায়বেলার উপদেশের মতো মনে হচ্ছে। সুতরাং আপনি আমাদের কিছু অসিয়ত করুন।’ তিনি বললেন, ‘আমি তোমাদেরকে আল্লাহভীতি অবলম্বন করার অসিয়ত করছি… তোমাদের মধ্যে যারা আমার পর জীবিত থাকবে, তারা অনেক মতবিরোধ দেখতে পাবে। তখন তোমাদের উপর অপরিহার্য হলো আমার সুন্নাহ এবং হিদায়াতপ্রাপ্ত খুলাফায়ে রাশিদীনের সুন্নাহ শক্তভাবে আঁকড়ে ধরা। আর দ্বীনের মাঝে নতুন উদ্ভাবিত বিষয়গুলো (বিদআত) থেকে সম্পূর্ণ বেঁচে থাকবে…।'” (সুনান আবু দাউদ ও তিরমিজি)
হাদিস – ২৯: কল্যাণের দরজাসমূহ
রাবী: মুআয ইবনে জাবাল (রা.)।
আরবি, উচ্চারণ ও শব্দার্থ:
عَنْ مُعَاذِ بْنِ جَبَلٍ (আন মুআযি বনি জাবালিন – মুআয ইবনে জাবাল হতে) قَالَ (কালা – তিনি বলেন): قُلْتُ (কুলতু – আমি বললাম): يَا رَسُولَ اللَّهِ (ইয়া রাসুলুল্লাহ – হে আল্লাহর রাসুল!) أَخْبِرْنِي بِعَمَلٍ يُدْخِلُنِي الْجَنَّةَ (আখবিরনি বিআমালিন ইউদখিলুনিল জান্নাতা – আমাকে এমন আমল সম্পর্কে জানান যা আমাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবে) وَيُبَاعِدُنِي عَنِ النَّارِ (ওয়া ইউবায়িদুনি আনিন নারি – এবং আমাকে জাহান্নাম থেকে দূরে সরিয়ে দেবে)…
قَالَ (কালা – তিনি বললেন): أَلَا أَدُلُّكَ عَلَى أَبْوَابِ الْخَيْرِ؟ (আলা আদুল্লুকা আলা আবওয়াবিল খাইরি – আমি কি তোমাকে কল্যাণের দরজাসমূহ দেখিয়ে দেব না?) الصَّوْمُ جُنَّةٌ (আসসাওমু জুন্নাতুন – রোজা হলো ঢাল), وَالصَّدَقَةُ تُطْفِئُ الْخَطِيئَةَ (ওয়াস সাদাকাতু তুতফিয়ুল খাতিআতা – আর সদকা গুনাহকে নিভিয়ে দেয়)…
পূর্ণাঙ্গ বঙ্গানুবাদ:
মুআয ইবনে জাবাল (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন: আমি বললাম, “হে আল্লাহর রাসুল! আমাকে এমন একটি আমলের কথা বলে দিন, যা আমাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবে এবং জাহান্নাম থেকে দূরে রাখবে।” তিনি বললেন, “তুমি একটি বিরাট বিষয় সম্পর্কে প্রশ্ন করেছ। তবে আল্লাহ যার জন্য সহজ করে দেন, তার জন্য এটি অত্যন্ত সহজ: তুমি আল্লাহর ইবাদত করবে এবং তাঁর সাথে কাউকে শরিক করবে না, সালাত কায়েম করবে, যাকাত আদায় করবে, রমজানের রোজা রাখবে এবং হজ করবে।” এরপর নবীজি বললেন, “আমি কি তোমাকে কল্যাণের দরজাসমূহ দেখিয়ে দেব না? রোজা হলো ঢালস্বরূপ। সদকা গুনাহকে ঠিক সেভাবে নিভিয়ে দেয়, যেভাবে পানি আগুনকে নিভিয়ে দেয়…” (সুনান তিরমিজি)
হাদিস – ৩০: আল্লাহর নির্ধারিত সীমা লংঘন না করা
রাবী: আবু সালাবা আল-খুশানি (রা.)।
আরবি, উচ্চারণ ও শব্দার্থ:
عَنْ أَبِي ثَعْلَبَةَ الْخُشَنِيِّ (আন আবি সা’লাবাতাল খুশানিয়্যি – আবু সালাবা আল-খুশানি হতে) عَنْ رَسُولِ اللَّهِ (আন রাসুলিল্লাহি – রাসুলুল্লাহ হতে) ﷺ قَالَ (কালা – তিনি বলেছেন):
إِنَّ اللَّهَ تَعَالَى فَرَضَ فَرَائِضَ فَلَا تُضَيِّعُوهَا (ইন্নাল্লাহা তাআলা ফারাদা ফারায়িদা ফালা তুদায়্যিয়ুহা – নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ কিছু বিষয় ফরজ করেছেন, অতএব তোমরা তা নষ্ট করো না), وَحَدَّ حُدُودًا فَلَا تَعْتَدُوهَا (ওয়া হাদ্দা হুদুদান ফালা তা’তাদুহা – এবং কিছু সীমা নির্ধারণ করেছেন, অতএব তোমরা তা লংঘন করো না), وَحَرَّمَ أَشْيَاءَ فَلَا تَنْتَهِكُوهَا (ওয়া হাররামা আশয়াআ ফালা তানতাহিাকুহা – এবং কিছু বিষয় হারাম করেছেন, অতএব তোমরা তাতে লিপ্ত হয়ো না), وَسَكَتَ عَنْ أَشْيَاءَ رَحْمَةً لَكُمْ غَيْرَ نِسْيَانٍ فَلَا تَبْحَثُوا عَنْهَا (ওয়া সাকাতা আন আশয়াআ রাহমাতান লাকুম গাইরা নিসইয়ানিন ফালা তাবহাসু আনহা – এবং তিনি ভুলে গিয়ে নয় বরং দয়াবশত কিছু বিষয় সম্পর্কে চুপ থেকেছেন, অতএব তোমরা সেসব বিষয়ে খোঁজাখুঁজি করো না)।
পূর্ণাঙ্গ বঙ্গানুবাদ:
আবু সালাবা আল-খুশানি (রা.) হতে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: “নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ কিছু বিষয় ফরজ (অবশ্যপালনীয়) করেছেন, সুতরাং তোমরা সেগুলো নষ্ট (বা বর্জন) করো না। তিনি কিছু সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছেন, তোমরা সেই সীমা লংঘন করো না। তিনি কিছু বিষয় হারাম করেছেন, তোমরা তাতে লিপ্ত হয়ো না। আর তিনি তোমাদের প্রতি দয়া করে—ভুলে গিয়ে নয়—কিছু বিষয় সম্পর্কে নীরব থেকেছেন, সুতরাং তোমরা সেসব বিষয় নিয়ে বেশি খোঁজাখুঁজি বা প্রশ্ন করো না।” (সুনান দারাকুতনি)
হাদিস – ৩১: দুনিয়া বিমুখতা (যুহদ)
রাবী: সাহল ইবনে সাদ আস-সায়িদী (রা.)।
আরবি, উচ্চারণ ও শব্দার্থ:
عَنْ سَهْلِ بْنِ سَعْدٍ السَّاعِدِيِّ (আন সাহলি বনি সা’দিন আস-সায়িদিয়্যি – সাহল ইবনে সাদ আস-সায়িদী হতে) قَالَ (কালা – তিনি বলেন): جَاءَ رَجُلٌ إِلَى النَّبِيِّ (জাআ রাজুলুন ইলান নাবিয়্যি – এক ব্যক্তি নবীজির কাছে এল) ﷺ فَقَالَ (ফাকালা – অতঃপর বলল): يَا رَسُولَ اللَّهِ (ইয়া রাসুলুল্লাহ – হে আল্লাহর রাসুল!) دُلَّنِي عَلَى عَمَلٍ (দুল্লানি আলা আমালিন – আমাকে এমন একটি আমল দেখিয়ে দিন) إِذَا عَمِلْتُهُ أَحَبَّنِي اللَّهُ (ইযা আমিলতুহু আহাব্বানিল্লাহু – যখন আমি তা করব আল্লাহ আমাকে ভালোবাসবেন) وَأَحَبَّنِي النَّاسُ (ওয়া আহাব্বানিন নাসু – এবং মানুষও আমাকে ভালোবাসবে)।
فَقَالَ (ফাকালা – অতঃপর তিনি বললেন): ازْهَدْ فِي الدُّنْيَا (ইযহাদ ফিদ দুনইয়া – দুনিয়ার প্রতি অনাগ্রহী হও) يُحِبَّكَ اللَّهُ (ইউহিব্বাকাল্লাহু – আল্লাহ তোমাকে ভালোবাসবেন), وَازْهَدْ فِيمَا فِي أَيْدِي النَّاسِ (ওয়াযহাদ ফিমা ফি আইদিন নাসি – এবং মানুষের হাতে যা আছে তার প্রতি অনাগ্রহী হও) يُحِبَّكَ النَّاسُ (ইউহিব্বাকান নাসু – মানুষ তোমাকে ভালোবাসবে)।
পূর্ণাঙ্গ বঙ্গানুবাদ:
সাহল ইবনে সাদ আস-সায়িদী (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন: এক ব্যক্তি নবী (সা.)-এর নিকট এসে বলল, “হে আল্লাহর রাসুল! আমাকে এমন একটি আমলের কথা বলে দিন, যা করলে আল্লাহ আমাকে ভালোবাসবেন এবং মানুষও আমাকে ভালোবাসবে।” নবীজি (সা.) বললেন, “দুনিয়ার প্রতি অনাগ্রহী (নির্লিপ্ত) হও, তাহলে আল্লাহ তোমাকে ভালোবাসবেন। আর মানুষের কাছে যা আছে তার প্রতি অনাগ্রহী হও (লোভ করো না), তাহলে মানুষ তোমাকে ভালোবাসবে।” (সুনান ইবনে মাজাহ)
হাদিস – ৩২: ক্ষতি করা এবং ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া নিষিদ্ধ
রাবী: আবু সাঈদ আল-খুদরি (রা.)।
আরবি, উচ্চারণ ও শব্দার্থ:
عَنْ أَبِي سَعِيدٍ سَعْدِ بْنِ مَالِكِ بْنِ سِنَانٍ الْخُدْرِيِّ (আন আবি সায়িদিন সা’দি বনি মালিকি বনি সিনানিন আল-খুদরিয়্যি – আবু সাঈদ সাদ ইবনে মালিক ইবনে সিনান আল-খুদরি হতে) أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ (আন্না রাসুলুল্লাহি – নিশ্চয়ই রাসুলুল্লাহ) ﷺ قَالَ (কালা – বলেছেন):
لَا ضَرَرَ (লা দারারা – ক্ষতি করা যাবে না) وَلَا ضِرَارَ (ওয়া লা দিরাআরা – এবং ক্ষতির বদলায় ক্ষতি করা যাবে না)।
পূর্ণাঙ্গ বঙ্গানুবাদ:
আবু সাঈদ সাদ ইবনে মালিক ইবনে সিনান আল-খুদরি (রা.) হতে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: “কারো ক্ষতি করা জায়েজ নেই, এবং ক্ষতির বদলায় (প্রতিশোধমূলক) ক্ষতি করাও জায়েজ নেই।” (সুনান ইবনে মাজাহ ও দারাকুতনি)
হাদিস – ৩৩: প্রমাণ ও শপথের নীতি
রাবী: আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.)।
আরবি, উচ্চারণ ও শব্দার্থ:
عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ (আনিবনি আব্বাসিন – ইবনে আব্বাস হতে) أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ (আন্না রাসুলুল্লাহি – নিশ্চয়ই রাসুলুল্লাহ) ﷺ قَالَ (কালা – বলেছেন):
لَوْ يُعْطَى النَّاسُ بِدَعْوَاهُمْ (লাও ইউ’তান নাসু বিদা’ওয়াহুম – যদি মানুষকে তাদের দাবি অনুযায়ী দিয়ে দেওয়া হতো), لَادَّعَى رِجَالٌ أَمْوَالَ قَوْمٍ وَدِمَاءَهُمْ (লাদ্দাআ রিজালুন আমওয়ালা কাওমিন ওয়া দিমাআহুম – তবে কিছু লোক অন্যদের সম্পদ ও জীবনের দাবি করত)।
لَكِنَّ الْبَيِّنَةَ عَلَى الْمُدَّعِي (লাকিননাল বায়্যিনাতা আলাল মুদ্দাআয়ি – কিন্তু প্রমাণ উপস্থাপন করা দাবিকারীর দায়িত্ব), وَالْيَمِينَ عَلَى مَنْ أَنْكَرَ (ওয়াল ইয়ামিনা আলা মান আনকারা – এবং শপথ করা অস্বীকারকারীর দায়িত্ব)।
পূর্ণাঙ্গ বঙ্গানুবাদ:
ইবনে আব্বাস (রা.) হতে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: “মানুষকে যদি কেবল তাদের দাবি অনুযায়ী সব দিয়ে দেওয়া হতো, তবে কিছু লোক অন্যের সম্পদ ও জীবনের দাবি করে বসত। কিন্তু নিয়ম হলো—যে দাবি করবে, প্রমাণ উপস্থাপন করা তার দায়িত্ব। আর যে অস্বীকার করবে (বিবাদী), শপথ করা তার দায়িত্ব।” (সুনান বায়হাকি)
হাদিস – ৩৪: অন্যায় কাজে বাধা প্রদান
রাবী: আবু সাঈদ আল-খুদরি (রা.)।
আরবি, উচ্চারণ ও শব্দার্থ:
عَنْ أَبِي سَعِيدٍ الْخُدْرِيِّ (আন আবি সায়িদিন আল-খুদরিয়্যি – আবু সাঈদ আল-খুদরি হতে) قَالَ (কালা – তিনি বলেন): سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ (সামি’তু রাসুলুল্লাহি – আমি রাসুলুল্লাহকে বলতে শুনেছি) ﷺ يَقُولُ (ইয়াকুলু – বলতে):
مَنْ رَأَى مِنْكُمْ مُنْكَرًا (মান রাআ মিনকুম মুনকারান – যে ব্যক্তি তোমাদের মধ্য থেকে কোনো অন্যায় কাজ দেখবে) فَلْيُغَيِّرْهُ بِيَدِهِ (ফালইউগায়্যিরহু বিইয়াদিহি – সে যেন তা তার হাত দিয়ে পরিবর্তন করে দেয়), فَإِنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَبِلِسَانِهِ (ফাইল-লাম ইয়াসতাত্বি’ ফাবিলিসানিহি – অতঃপর যদি সে সামর্থ্য না রাখে তবে তার মুখ দিয়ে), فَإِنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَبِقَلْبِهِ (ফাইল-লাম ইয়াসতাত্বি’ ফাবিকালবিহি – অতঃপর যদি সে সামর্থ্য না রাখে তবে তার অন্তর দিয়ে), وَذَلِكَ أَضْعَفُ الْإِيمَانِ (ওয়া যালিকা আদআফুল ঈমানি – আর তা হলো সবচেয়ে দুর্বল ঈমান)।
পূর্ণাঙ্গ বঙ্গানুবাদ:
আবু সাঈদ আল-খুদরি (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে বলতে শুনেছি: “তোমাদের কেউ যখন কোনো অন্যায় কাজ হতে দেখে, সে যেন তার হাত (শক্তি) দিয়ে তা প্রতিহত করে। যদি সে এর সামর্থ্য না রাখে, তবে যেন মুখ (কথা) দিয়ে এর প্রতিবাদ করে। আর যদি এরও সামর্থ্য না রাখে, তবে যেন অন্তর দিয়ে তা ঘৃণা করে (এবং তা পরিবর্তনের আশা রাখে)। আর এটি হলো সবচেয়ে দুর্বল স্তরের ঈমান।” (সহিহ মুসলিম)
হাদিস – ৩৫: ইসলামি ভ্রাতৃত্ব ও সামাজিক শিষ্টাচার
রাবী: আবু হুরায়রা (রা.)।
আরবি, উচ্চারণ ও শব্দার্থ:
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ (আন আবি হুরাইরাতা – আবু হুরায়রা হতে) قَالَ (কালা – তিনি বলেন): قَالَ رَسُولُ اللَّهِ (কালা রাসুলুল্লাহি – রাসুলুল্লাহ বলেছেন) ﷺ:
لَا تَحَاسَدُوا (লা তাহাসাদু – তোমরা পরস্পর হিংসা করো না), وَلَا تَنَاجَشُوا (ওয়া লা তানাজাশু – এবং ধোঁকা দেওয়ার জন্য দাম বাড়িও না), وَلَا تَبَاغَضُوا (ওয়া লা তাবাগাদু – এবং পরস্পর বিদ্বেষ পোষণ করো না), وَلَا تَدَابَرُوا (ওয়া লা তাদাবারু – এবং একে অপরের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ো না), وَلَا يَبِعْ بَعْضُكُمْ عَلَى بَيْعِ بَعْضٍ (ওয়া লা ইয়াবি’ বা’দুকুম আলা বাইয়ি বা’দিন – এবং একজনের বেচাকেনার ওপর অন্যজন বেচাকেনা করো না), وَكُونُوا عِبَادَ اللَّهِ إِخْوَانًا (ওয়া কুনু ইবাদাল্লাহি ইখওয়ানান – বরং তোমরা আল্লাহর বান্দা হিসেবে ভাই ভাই হয়ে যাও)।
الْمُسْلِمُ أَخُو الْمُسْلِمِ (আল-মুসলিমু আখুল মুসলিমি – এক মুসলিম অন্য মুসলিমের ভাই): لَا يَظْلِمُهُ (লা ইয়াযলিমুহু – সে তার ওপর জুলুম করে না), وَلَا يَخْذُلُهُ (ওয়া লা ইয়াখযুলুহু – তাকে অপমানিত করে না), وَلَا يَكْذِبُهُ (ওয়া লা ইয়াকযিবুহু – তার সাথে মিথ্যা বলে না), وَلَا يَحْقِرُهُ (ওয়া লা ইয়াহকিরুহু – এবং তাকে তুচ্ছজ্ঞান করে না)।
التَّقْوَى هَاهُنَا (আত-তাকওয়া হাহুনা – তাকওয়া এখানেই রয়েছে) – يُشِيرُ إِلَى صَدْرِهِ ثَلَاثَ مَرَّاتٍ (ইউশিরু ইলা সাদরিহি সালাসা মাররাতিন – তিনি তার বুকের দিকে তিনবার ইশারা করলেন)। بِحَسْبِ امْرِئٍ مِنَ الشَّرِّ (বিহাসবি ইমরিয়িন মিনাশ শাররি – কোনো ব্যক্তির মন্দের জন্য এতটুকুই যথেষ্ট) أَنْ يَحْقِرَ أَخَاهُ الْمُسْلِمَ (আন ইয়াহকিরা আখাহুল মুসলিমা – যে সে তার মুসলিম ভাইকে তুচ্ছজ্ঞান করবে)।
كُلُّ الْمُسْلِمِ عَلَى الْمُسْلِمِ حَرَامٌ (কুল্লুল মুসলিমি আলাল মুসলিমি হারামুন – প্রত্যেক মুসলিমের অপর মুসলিমের উপর হারাম): دَمُهُ وَمَالُهُ وَعِرْضُهُ (দামুহু ওয়া মালুহু ওয়া ইরদুহু – তার রক্ত, তার সম্পদ এবং তার সম্মান)।
পূর্ণাঙ্গ বঙ্গানুবাদ:
আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: “তোমরা একে অপরের প্রতি হিংসা পোষণ করো না, ধোঁকা দেওয়ার জন্য (নিলামে) পণ্যের দাম বাড়িও না, একে অপরের প্রতি বিদ্বেষ রেখো না, একে অপরের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ো না এবং একজনের বেচাকেনার ওপর অন্যজন বেচাকেনা করো না। বরং হে আল্লাহর বান্দারা! তোমরা পরস্পর ভাই ভাই হয়ে যাও। এক মুসলিম অপর মুসলিমের ভাই। সে তার ওপর জুলুম করবে না, তাকে লজ্জিত বা অপমানিত করবে না, তার সাথে মিথ্যা বলবে না এবং তাকে তুচ্ছজ্ঞান করবে না। ‘তাকওয়া হলো এখানে’—এ কথা বলে তিনি নিজের বুকের দিকে তিনবার ইশারা করলেন। কোনো মানুষের খারাপ হওয়ার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে, সে তার মুসলিম ভাইকে তুচ্ছজ্ঞান করে। এক মুসলিমের রক্ত, সম্পদ এবং সম্মান অন্য মুসলিমের জন্য সম্পূর্ণ হারাম।” (সহিহ মুসলিম)
হাদিস – ৩৬: সাহায্য করা ও ইলম অর্জন
রাবী: আবু হুরায়রা (রা.)।
আরবি, উচ্চারণ ও শব্দার্থ:
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ (আন আবি হুরাইরাতা – আবু হুরায়রা হতে) عَنِ النَّبِيِّ (আনিন নাবিয়্যি – নবী হতে) ﷺ قَالَ (কালা – তিনি বলেছেন):
مَنْ نَفَّسَ عَنْ مُؤْمِنٍ كُرْبَةً (মান নাফফাসা আন মুমিনিন কুরবাতান – যে ব্যক্তি কোনো মুমিনের একটি বিপদ দূর করবে) مِنْ كُرَبِ الدُّنْيَا (মিন কুরাবিদ দুনইয়া – দুনিয়ার বিপদগুলোর মধ্য থেকে), نَفَّسَ اللَّهُ عَنْهُ كُرْبَةً مِنْ كُرَبِ يَوْمِ الْقِيَامَةِ (নাফফাসাল্লাহু আনহু কুরবাতান মিন কুরাবি ইয়াওমিল কিয়ামাতি – আল্লাহ তার কিয়ামতের দিনের বিপদগুলোর মধ্য থেকে একটি বিপদ দূর করবেন)।
وَمَنْ سَلَكَ طَرِيقًا يَلْتَمِسُ فِيهِ عِلْمًا (ওয়া মান সালাকা তরিকান ইয়ালতামিসু ফিহি ইলমান – আর যে ব্যক্তি এমন রাস্তায় চলবে যাতে সে ইলম অনুসন্ধান করে), سَهَّلَ اللَّهُ لَهُ بِهِ طَرِيقًا إِلَى الْجَنَّةِ (সাহহালাল্লাহু লাহু বিহি তরিকان ইলাল জান্নাতি – আল্লাহ এর মাধ্যমে তার জন্য জান্নাতের রাস্তা সহজ করে দেবেন)।
وَاللَّهُ فِي عَوْنِ الْعَبْدِ مَا كَانَ الْعَبْدُ فِي عَوْنِ أَخِيهِ (ওয়াল্লাহু ফি আওনিল আবদি মা কানال আবদু ফি আওনি আখিহি – আর আল্লাহ বান্দার সাহায্যে থাকেন, যতক্ষণ বান্দা তার ভাইয়ের সাহায্যে থাকে)।
পূর্ণাঙ্গ বঙ্গানুবাদ:
আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত, নবী (সা.) বলেছেন: “যে ব্যক্তি দুনিয়াতে কোনো মুমিনের একটি কষ্ট বা বিপদ দূর করে দেবে, আল্লাহ কিয়ামতের দিন তার একটি বিপদ দূর করে দেবেন। যে ব্যক্তি কোনো ঋণগ্রস্ত অভাবীর অভাব দূর করবে বা সহজ করে দেবে, আল্লাহ দুনিয়া ও আখিরাতে তার জন্য সহজ করে দেবেন। যে ব্যক্তি কোনো মুসলিমের দোষত্রুটি গোপন রাখবে, আল্লাহ দুনিয়া ও আখিরাতে তার দোষত্রুটি গোপন রাখবেন। বান্দা যতক্ষণ তার ভাইয়ের সাহায্যে নিয়োজিত থাকে, আল্লাহ ততক্ষণ সেই বান্দার সাহায্যে নিয়োজিত থাকেন। যে ব্যক্তি ইলম বা জ্ঞান অর্জনের জন্য কোনো পথ অবলম্বন করে, আল্লাহ এর বিনিময়ে তার জন্য জান্নাতের পথ সহজ করে দেন। আর যখন কোনো সম্প্রদায় আল্লাহর কোনো ঘরে (মসজিদে) একত্রিত হয়ে আল্লাহর কিতাব তিলাওয়াত করে এবং নিজেদের মধ্যে তা অধ্যয়ন করে, তখন তাদের ওপর প্রশান্তি নাজিল হয়, আল্লাহর রহমত তাদের আচ্ছাদিত করে, ফেরেশতারা তাদের ঘিরে রাখে এবং আল্লাহ তাঁর নিকটবর্তী ফেরেশতাদের কাছে তাদের কথা স্মরণ করেন। আর যার আমল তাকে পিছিয়ে দেবে, তার বংশমর্যাদা তাকে এগিয়ে নিতে পারবে না।” (সহিহ মুসলিম)
হাদিস – ৩৭: নেকি ও পাপের হিসাব
রাবী: আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.)।
আরবি, উচ্চারণ ও শব্দার্থ:
عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ (আনিবনি আব্বাসিন – ইবনে আব্বাস হতে) عَنْ رَسُولِ اللَّهِ (আন রাসুলিল্লাহি – রাসুলুল্লাহ হতে) ﷺ فِيمَا يَرْوِي عَنْ رَبِّهِ (ফিما ইয়ারউয়ি আন রাব্বিহি – যা তিনি তাঁর রবের পক্ষ হতে বর্ণনা করেন) قَالَ (কালা – তিনি বলেছেন):
إِنَّ اللَّهَ كَتَبَ الْحَسَنَاتِ وَالسَّيِّئَاتِ (ইন্নাল্লাহা কাতাবাল হাসানতি ওয়াস সাইয়্যিআতি – নিশ্চয়ই আল্লাহ নেকি ও পাপসমূহ লিখেছেন) ثُمَّ بَيَّنَ ذَلِكَ (সুম্মা বায়্যানা যালিকা – অতঃপর তা স্পষ্ট করেছেন): فَمَنْ هَمَّ بِحَسَنَةٍ فَلَمْ يَعْمَلْهَا (ফামান হাম্মা বিহাসানাতিন ফালাম ইয়া’মালহা – অতঃপর যে ব্যক্তি নেক কাজের ইচ্ছা করল কিন্তু তা করল না), كَتَبَهَا اللَّهُ عِنْدَهُ حَسَنَةً كَامِلَةً (কাতাবাহাল্লাহু ইনদাহু হাসানাতান কামিলাতান – আল্লাহ তাঁর কাছে তা পূর্ণাঙ্গ নেকি হিসেবে লিখে দেন)…
পূর্ণাঙ্গ বঙ্গানুবাদ:
ইবনে আব্বাস (রা.) হতে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর বরকতময় ও সুমহান রবের পক্ষ হতে হাদিসে কুদসিতে বর্ণনা করেন: “নিশ্চয়ই আল্লাহ নেকি ও পাপসমূহ নির্ধারণ করে তা স্পষ্টভাবে বর্ণনা করে দিয়েছেন। সুতরাং কেউ যদি কোনো ভালো কাজের ইচ্ছা বা সংকল্প করে, কিন্তু কাজটি করতে না পারে, তবু আল্লাহ নিজের কাছে তার জন্য একটি পূর্ণ নেকি লিখে দেন। আর যদি সে ইচ্ছা করার পর কাজটি সম্পন্ন করে, তবে আল্লাহ নিজের কাছে তার জন্য দশ গুণ থেকে সাতশত গুণ, বরং তার চেয়েও বহুগুণ বেশি নেকি লিখে দেন। পক্ষান্তরে, কেউ যদি কোনো পাপ কাজের ইচ্ছা করে, কিন্তু তা থেকে বিরত থাকে (আল্লাহর ভয়ে), তবে আল্লাহ নিজের কাছে তার জন্য একটি পূর্ণ নেকি লিখে দেন। আর যদি সে ইচ্ছা করার পর পাপ কাজটি করেই ফেলে, তবে আল্লাহ তার জন্য কেবল একটি পাপই লিপিবদ্ধ করেন।” (সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম)
হাদিস – ৩৮: আল্লাহর নৈকট্য ও নফল ইবাদত
রাবী: আবু হুরায়রা (রা.)।
আরবি, উচ্চারণ ও শব্দার্থ:
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ (আন আবি হুরাইরাতা – আবু হুরায়রা হতে) قَالَ (কালা – তিনি বলেন): قَالَ رَسُولُ اللَّهِ (কালা রাসুলুল্লাহি – রাসুলুল্লাহ বলেছেন) ﷺ: إِنَّ اللَّهَ تَعَالَى قَالَ (ইন্নাল্লাহা তাআলা কালা – নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ বলেছেন):
مَنْ عَادَى لِي وَلِيًّا (মান আদা লি ওয়ালিয়্যান – যে ব্যক্তি আমার কোনো অলির সাথে শত্রুতা পোষণ করে) فَقَدْ آذَنْتُهُ بِالْحَرْبِ (ফাকাদ আযানতুহু বিলহারবি – আমি তার বিরুদ্ধে যুদ্ধের ঘোষণা দিচ্ছি)। وَمَا تَقَرَّبَ إِلَيَّ عَبْدِي بِشَيْءٍ (ওয়া মা তাকাররাবা ইলাইয়্যা আবদি বিশাইয়িন – আমার বান্দা এমন কোনো কিছু দ্বারা আমার নৈকট্য লাভ করতে পারে না) أَحَبَّ إِلَيَّ مِمَّا افْتَرَضْتُ عَلَيْهِ (আহাব্বা ইলাইয়্যা মিম্মাফতারাদতু আলাইহি – যা আমার কাছে অধিক প্রিয় ওই বস্তু থেকে যা আমি তার ওপর ফরজ করেছি)। وَمَا يَزَالُ عَبْدِي يَتَقَرَّبُ إِلَيَّ بِالنَّوَافِلِ (ওয়া মা ইয়াযালু আবদি ইয়াতাকাররাবু ইলাইয়্যা বিন্নাওয়াফিলি – আর সর্বদা আমার বান্দা নফল ইবাদতের মাধ্যমে আমার নৈকট্য অর্জন করতে থাকে) حَتَّى أُحِبَّهُ (হাত্তা উহিব্বাহু – এমনকি আমি তাকে ভালোবাসতে শুরু করি)।
পূর্ণাঙ্গ বঙ্গানুবাদ:
আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: মহান আল্লাহ বলেন, “যে ব্যক্তি আমার কোনো অলি (বন্ধু/প্রিয় বান্দা)-এর সাথে শত্রুতা পোষণ করে, আমি তার বিরুদ্ধে যুদ্ধের ঘোষণা দিই। আমি আমার বান্দার ওপর যা ফরজ করেছি, তার চেয়ে আমার কাছে অধিক প্রিয় এমন কোনো মাধ্যম নেই, যার দ্বারা সে আমার নৈকট্য লাভ করতে পারে। আর আমার বান্দা নফল ইবাদতের মাধ্যমে ক্রমাগত আমার নৈকট্য অর্জন করতে থাকে, এমনকি একপর্যায়ে আমি তাকে ভালোবাসতে শুরু করি। আর আমি যখন তাকে ভালোবাসি, তখন আমি তার কান হয়ে যাই—যা দিয়ে সে শোনে; তার চোখ হয়ে যাই—যা দিয়ে সে দেখে; তার হাত হয়ে যাই—যা দিয়ে সে ধরে; এবং তার পা হয়ে যাই—যা দিয়ে সে হাঁটে। সে আমার কাছে কিছু চাইলে আমি অবশ্যই তাকে তা দান করি, আর সে আমার কাছে আশ্রয় চাইলে আমি অবশ্যই তাকে আশ্রয় প্রদান করি।” (সহিহ বুখারি)
হাদিস – ৩৯: ভুল, বিস্মৃতি ও বাধ্যবাধকতা ক্ষমাযোগ্য
রাবী: আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.)।
আরবি, উচ্চারণ ও শব্দার্থ:
عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ (আনিবনি আব্বাসিন – ইবনে আব্বাস হতে) أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ (আন্না রাসুলুল্লাহি – নিশ্চয়ই রাসুলুল্লাহ) ﷺ قَالَ (কালা – বলেছেন):
إِنَّ اللَّهَ تَجَاوَزَ لِي عَنْ أُمَّتِي (ইন্নাল্লাহা তাজাওয়াযা লি আন উম্মাতি – নিশ্চয়ই আল্লাহ আমার খাতিরে আমার উম্মতের মধ্য থেকে ক্ষমা করে দিয়েছেন) الْخَطَأَ (আলখাতাআ – ভুলবশত করা কাজ), وَالنِّسْيَانَ (ওয়ান নিসইয়ানা – এবং ভুলে যাওয়া কাজ), وَمَا اسْتُكْرِهُوا عَلَيْهِ (ওয়া মাসতুকরিহু আলাইহি – এবং ওই কাজ যা করতে তাদের বাধ্য করা হয়েছে)।
পূর্ণাঙ্গ বঙ্গানুবাদ:
ইবনে আব্বাস (রা.) হতে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: “নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা আমার সম্মানে আমার উম্মতের ভুলবশত করা কাজ, বিস্মৃতিবশত (ভুলে গিয়ে) করা কাজ এবং যে অন্যায়টি করতে তাদের বাধ্য করা হয়েছে—তা ক্ষমা করে দিয়েছেন।” (সুনান ইবনে মাজাহ ও বায়হাকি)
হাদিস – ৪০: দুনিয়াতে মুসাফির হয়ে থাকা
রাবী: আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা.)।
আরবি, উচ্চারণ ও শব্দার্থ:
عَنِ ابْنِ عُمَرَ (আনিবনি উমারা – ইবনে উমর হতে) قَالَ (কালা – তিনি বলেন): أَخَذَ رَسُولُ اللَّهِ (আখাযা রাসুলুল্লাহি – রাসুলুল্লাহ ধরলেন) ﷺ بِمَنْكِبَيَّ (বিমানকিবাইয়্যা – আমার দুই কাঁধ) فَقَالَ (ফাকালা – অতঃপর বললেন):
كُنْ فِي الدُّنْيَا كَأَنَّكَ غَرِيبٌ (কুন ফিদ দুনইয়া কাআন্নাকা গরিবুন – দুনিয়াতে এমনভাবে থাকো যেন তুমি একজন আগন্তুক) أَوْ عَابِرُ سَبِيلٍ (আও আবিরু সাবিলিন – অথবা পথচারী)।
পূর্ণাঙ্গ বঙ্গানুবাদ:
ইবনে উমর (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন: একদিন রাসুলুল্লাহ (সা.) আমার দুই কাঁধ ধরে বললেন, “তুমি দুনিয়াতে এমনভাবে জীবনযাপন করো, যেন তুমি একজন আগন্তুক (প্রবাসী) অথবা একজন পথচারী মুসাফির।”
আর ইবনে উমর (রা.) প্রায়ই বলতেন, “যখন তুমি সন্ধ্যায় পৌঁছাবে, তখন সকালের অপেক্ষায় থেকো না। আর যখন তুমি সকালে পৌঁছাবে, তখন সন্ধ্যার অপেক্ষায় থেকো না। তোমার সুস্থ অবস্থায় অসুস্থতার জন্য (নেক আমলের) প্রস্তুতি নাও এবং তোমার জীবনেই মৃত্যুর জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করো।” (সহিহ বুখারি)
হাদিস – ৪১: নফস বা প্রবৃত্তিকে শরীয়তের অনুগামী করা
রাবী: আব্দুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস (রা.)।
আরবি, উচ্চারণ ও শব্দার্থ:
عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عَمْرِو بْنِ الْعَاصِ (আন আবদিল্লাহি বনি আমরি ব্নিল আস – আব্দুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস হতে) قَالَ (কালা – তিনি বলেন): قَالَ رَسُولُ اللَّهِ (কালা রাসুলুল্লাহি – রাসুলুল্লাহ বলেছেন) ﷺ:
لَا يُؤْمِنُ أَحَدُكُمْ (লা ইউমিনু আহাদুকুম – তোমাদের কেউ পূর্ণ মুমিন হতে পারবে না) حَتَّى يَكُونَ هَوَاهُ (হাত্তা ইয়াকুনা হাওয়াহু – যে পর্যন্ত না তার প্রবৃত্তি হয়ে যায়) تَبَعًا لِمَا جِئْتُ بِهِ (তবাআন লিমা জি’তু বিহি – ওই বিষয়ের অনুগামী যা আমি নিয়ে এসেছি)।
পূর্ণাঙ্গ বঙ্গানুবাদ:
আব্দুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস (রা.) হতে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: “তোমাদের কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গ মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না তার প্রবৃত্তি ও পছন্দ সেই দ্বীনের অনুগামী হয়, যা আমি নিয়ে এসেছি।” (কিতাবুল হুজ্জাহ)
হাদিস – ৪২: আল্লাহর অসীম ক্ষমা
রাবী: আনাস ইবনে মালিক (রা.)।
আরবি, উচ্চারণ ও শব্দার্থ:
عَنْ أَنَسٍ (আন আনাসিন – আনাস হতে) قَالَ (কালা – তিনি বলেন): سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ (সামি’তু রাসুলুল্লাহি – আমি রাসুলুল্লাহকে বলতে শুনেছি) ﷺ يَقُولُ (ইয়াকুলু – বলতে): قَالَ اللَّهُ تَعَالَى (কালাল্লাহু তাআলা – মহান আল্লাহ বলেছেন):
يَا ابْنَ آدَمَ (য়াবনা আদামা – হে আদম সন্তান!) إِنَّكَ مَا دَعَوْتَنِي وَرَجَوْتَنِي (ইন্নাকা মা দাআওতানি ওয়া রাজাওতানি – নিশ্চয়ই তুমি যতক্ষণ আমাকে ডাকবে এবং আমার কাছে আশা রাখবে) غَفَرْتُ لَكَ عَلَى مَا كَانَ فِيكَ وَلَا أُبَالِي (গাফারতু লাকা আলা মা কানা ফিকা ওয়া লা উবালি – তোমার মাঝে যা-ই থাকুক না কেন আমি তোমাকে ক্ষমা করে দেব এবং আমি পরোয়া করি না)।
يَا ابْنَ آدَمَ (য়াবনা আদামা – হে আদম সন্তান!) لَوْ بَلَغَتْ ذُنُوبُكَ عَنَانَ السَّمَاءِ (লাও বালাগত যুনুবুকা আনানাস সামায়ি – যদি তোমার গুনাহসমূহ আসমানের মেঘমালা পর্যন্ত পৌঁছে যায়) ثُمَّ اسْتَغْفَرْتَنِي غَفَرْتُ لَكَ وَلَا أُبَالِي (সুম্মাসতাগফারতানি গাফারতু লাকা ওয়া লা উবালি – অতঃপর তুমি আমার কাছে ক্ষমা চাও, আমি তোমাকে ক্ষমা করে দেব এবং আমি পরোয়া করি না)।
পূর্ণাঙ্গ বঙ্গানুবাদ:
আনাস (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে বলতে শুনেছি: “মহান আল্লাহ বলেছেন: হে আদম সন্তান! তুমি যতক্ষণ আমাকে ডাকবে এবং আমার কাছে ক্ষমার আশা রাখবে, তোমার থেকে যত গুনাহই প্রকাশ পাক না কেন, আমি তোমাকে ক্ষমা করে দেব, আমি কোনো পরোয়া করি না। হে আদম সন্তান! তোমার গুনাহ যদি আসমানের মেঘমালা পর্যন্তও পৌঁছে যায়, এরপর তুমি আমার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো, আমি তোমাকে ক্ষমা করে দেব, আমি কোনো পরোয়া করি না। হে আদম সন্তান! তুমি যদি আমার কাছে পৃথিবী-পরিমাণ গুনাহ নিয়েও উপস্থিত হও, আর আমার সাথে কাউকে শরিক না করে থাকো, তবে আমি ঠিক পৃথিবী-পরিমাণ ক্ষমা নিয়েই তোমার সামনে উপস্থিত হব।” (সুনান তিরমিজি)