মাওলানা আশরাফ আলী থানবী (রহ.): উম্মাহর আধ্যাত্মিক চিকিৎসক ও যুগশ্রেষ্ঠ মুজাদ্দিদ

ভারতীয় উপমহাদেশের ইসলামী ইতিহাসে যে কয়জন ক্ষণজন্মা মনীষী কুরআন-সুন্নাহর বিশুদ্ধ জ্ঞান এবং আত্মশুদ্ধির (তাসাউফ) অপূর্ব সমন্বয় ঘটিয়ে সমাজে যুগান্তকারী পরিবর্তন এনেছিলেন, মাওলানা আশরাফ আলী থানবী (রহ.) তাঁদের মধ্যে অন্যতম। তাঁর ইলমী গভীরতা, সমাজ সংস্কার এবং উম্মাহর প্রতি অপরিসীম দরদের কারণে তাঁকে ‘হাকিমুল উম্মত’ বা ‘উম্মাহর আধ্যাত্মিক চিকিৎসক’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়। বিংশ শতাব্দীর প্রথম ভাগে মুসলিম সমাজের আকাইদ, ইবাদত এবং সামাজিক জীবনের কুসংস্কার দূর করতে তাঁর অবদান অবিস্মরণীয়।

## জন্ম ও বংশপরিচয়

মাওলানা আশরাফ আলী থানবী (রহ.) ১৮৬৩ খ্রিস্টাব্দের ১৯ আগস্ট (৫ রবিউস সানি, ১২৮০ হিজরি) ভারতের উত্তর প্রদেশের মুজাফফরনগর জেলার অন্তর্গত ঐতিহাসিক ‘থানাভবন’ নামক এক বর্ধিষ্ণু জনপদে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বংশলতিকা ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হযরত উমর ফারুক (রা.)-এর সাথে মিলিত হয়েছে, যে কারণে তাঁকে ‘ফারুকী’ বলা হয়। তাঁর পিতা আব্দুল হক ছিলেন একজন অত্যন্ত সৎ, ধার্মিক এবং বিত্তবান জমিদার।

মাত্র পাঁচ বছর বয়সে তিনি তাঁর স্নেহময়ী মাতাকে হারান। পিতৃহীন না হলেও মাতৃহীন এই শিশুর লালন-পালনের দায়িত্ব অত্যন্ত স্নেহের সাথে পালন করেন তাঁর দাদি ও অন্যান্য আত্মীয়স্বজন। শৈশব থেকেই তিনি অত্যন্ত শান্ত, চিন্তাশীল এবং প্রখর স্মৃতিশক্তির অধিকারী ছিলেন।

## প্রাথমিক শিক্ষা ও দারুল উলুম দেওবন্দে অধ্যয়ন

তাঁর শিক্ষাজীবনের হাতেখড়ি হয় নিজ গ্রাম থানাভবনেই। অত্যন্ত অল্প বয়সে হাফেজ হুসাইন আলীর তত্ত্বাবধানে তিনি পবিত্র কুরআন মাজীদ সম্পূর্ণ হিফজ করেন। এরপর মাওলানা ফতেহ মুহাম্মাদ (রহ.)-এর কাছে ফার্সি ও আরবি ভাষার প্রাথমিক কিতাবাদি অত্যন্ত সুচারুরূপে অধ্যয়ন করেন।

উচ্চতর ইসলামী জ্ঞান অর্জনের অদম্য স্পৃহায় ১২৯৫ হিজরিতে তিনি উপমহাদেশের প্রখ্যাত ইসলামী বিদ্যাপীঠ ‘দারুল উলুম দেওবন্দ’-এ ভর্তি হন। দেওবন্দে তিনি তৎকালীন শ্রেষ্ঠ ইসলামী স্কলারদের সান্নিধ্য লাভ করার সুযোগ পান। তাঁর প্রধান উস্তাদদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন মাওলানা মুহাম্মাদ ইয়াকুব নানুতবী (রহ.) এবং শাইখুল হিন্দ মাওলানা মাহমুদ হাসান দেওবন্দী (রহ.)। ছাত্রজীবনেই তাঁর অসাধারণ মেধা ও বুদ্ধিমত্তা উস্তাদদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। ১৩০১ হিজরিতে (১৮৮৩ খ্রিস্টাব্দ) মাত্র ১৯ বছর বয়সে তিনি দারুল উলুম দেওবন্দ থেকে দাওরায়ে হাদিস (মাস্টার্স সমমান) পরীক্ষায় সর্বোচ্চ কৃতিত্বের সাথে উত্তীর্ণ হন।

## তাসাউফ ও আধ্যাত্মিক দীক্ষা

মাওলানা থানবী (রহ.) কেবল পুথিগত বিদ্যাতেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না। ইলমে দ্বীনের পাশাপাশি আত্মশুদ্ধি বা তাযকিয়াহ অর্জনের তীব্র আকাঙ্ক্ষা তাঁকে তাড়িত করত। এই উদ্দেশ্যে তিনি সে যুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ আধ্যাত্মিক সাধক হাজী ইমদাদুল্লাহ মুহাজিরে মক্কী (রহ.)-এর হাতে বাইআত (শিষ্যত্ব) গ্রহণ করেন।

তিনি মক্কায় গিয়ে তাঁর শাইখের সান্নিধ্যে দীর্ঘ সময় কাটান এবং আধ্যাত্মিক সাধনায় নিমগ্ন হন। হাজী ইমদাদুল্লাহ (রহ.) তাঁর এই শিষ্যের আধ্যাত্মিক উৎকর্ষ, শরীয়তের প্রতি পূর্ণ আনুগত্য এবং প্রজ্ঞায় মুগ্ধ হন। তিনি মাওলানা থানবী (রহ.)-কে খেলাফত (আধ্যাত্মিক প্রতিনিধিত্ব) প্রদান করেন এবং ভারতে ফিরে গিয়ে সাধারণ মানুষের আত্মশুদ্ধি ও সমাজ সংস্কারের কাজে আত্মনিয়োগ করার নির্দেশ দেন।

## কর্মজীবন, শিক্ষকতা ও খানকা প্রতিষ্ঠা

শিক্ষাজীবন সমাপ্ত করার পর তিনি কানপুরের ‘মাদরাসা ফয়জে আম’-এ শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। সেখানে তিনি দীর্ঘ ১৪ বছর হাদিস, তাফসির ও ফিকহ শাস্ত্রের অত্যন্ত সফলতার সাথে পাঠদান করেন। এই সময়কালে তিনি শিক্ষকতার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের মাঝে ওয়াজ-নসিহত এবং ফতোয়া প্রদানের মাধ্যমে ব্যাপক সংস্কারমূলক কাজ করেন। তাঁর সুমধুর ও হৃদয়গ্রাহী বক্তব্য শোনার জন্য দূরদূরান্ত থেকে মানুষ ছুটে আসত।

পরবর্তীতে ১৮৯৭ খ্রিস্টাব্দে তিনি কানপুর ত্যাগ করে নিজের জন্মস্থান থানাভবনে ফিরে আসেন। সেখানে তিনি তাঁর পীরের নির্দেশে ‘খানকায়ে ইমদাদিয়া’ নামক একটি আধ্যাত্মিক কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেন। জীবনের বাকি প্রায় ৪৬ বছর তিনি এখানেই অতিবাহিত করেন। এই খানকাটি সে সময় ভারতীয় উপমহাদেশের আত্মশুদ্ধি, ইলমী গবেষণা এবং ফতোয়া প্রদানের অন্যতম প্রধান স্নায়ুকেন্দ্রে পরিণত হয়। বহু বড় বড় আলেম এবং বুদ্ধিজীবী অহংকার মুক্ত হয়ে আত্মিক প্রশান্তির জন্য এই খানকায় তাঁর সান্নিধ্যে এসে দিনের পর দিন পড়ে থাকতেন।

## সুবিশাল ও কালজয়ী সাহিত্যিক উত্তরাধিকার (Literary Legacy)

মাওলানা আশরাফ আলী থানবী (রহ.)-এর জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ এবং সবচেয়ে প্রভাবশালী দিক হলো তাঁর সুবিশাল ও কালজয়ী সাহিত্যিক উত্তরাধিকার। তিনি অত্যন্ত সাবলীল, প্রাঞ্জল ও বোধগম্য ভাষায় ইসলামী জ্ঞানকে সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিয়েছেন। তাঁর লেখনীর পরিধি তাফসির, হাদিস, ফিকহ, তাসাউফ, আকিদা, অর্থনীতি এবং সমাজ সংস্কারসহ ইসলামী জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রায় প্রতিটি শাখায় বিস্তৃত। তাঁর রচিত ছোট-বড় গ্রন্থ, পুস্তিকা এবং বয়ান সংকলনের সংখ্যা প্রায় এক হাজারের কাছাকাছি। ঐতিহাসিক প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বদের সাহিত্যিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক অবদানের ইতিহাসে তাঁর রচিত গ্রন্থাবলি আজো এক অনন্য মাইলফলক।

তাঁর শতাব্দীর পর শতাব্দী টিকে থাকার মতো কয়েকটি যুগান্তকারী গ্রন্থ নিচে তুলে ধরা হলো:

  • বায়ানুল কুরআন: উর্দু ভাষায় রচিত এটি তাঁর জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ তাফসির গ্রন্থ। আরবি ভাষা ও ব্যাকরণের সূক্ষ্ম তাত্ত্বিক দিকগুলো বজায় রেখে তিনি অত্যন্ত গভীর অর্থবহ এই তাফসির রচনা করেছেন। উপমহাদেশের বড় বড় মুফাসসির ও আলেমদের জন্য এটি আজো একটি নির্ভরযোগ্য রেফারেন্স বা উৎসগ্রন্থ।
  • বেহেশতী জেওর: এটি তাঁর সবচেয়ে বেশি পঠিত এবং সমাজ-সংস্কারমূলক একটি কালজয়ী বিশ্বকোষ। মূলত নারীদেরকে ইসলামী ফিকহ, দৈনন্দিন জীবনের মাসআলা, আকাইদ এবং ইসলামী শিষ্টাচার শেখানোর উদ্দেশ্যে অত্যন্ত সহজ ভাষায় তিনি এটি রচনা করেন। যে যুগে নারী শিক্ষার চরম অভাব ছিল, সে যুগে এই বইটি প্রতিটি মুসলিম পরিবারে নারীদের জন্য মাদরাসার বিকল্প হিসেবে কাজ করেছে।
  • ইমদাদুল ফাতাওয়া: তাঁর সুদীর্ঘ কর্মজীবনে মানুষের বিভিন্ন জটিল প্রশ্নের উত্তরে তিনি যে হাজার হাজার গবেষণাধর্মী ফতোয়া প্রদান করেছেন, তার সুবিশাল সংকলন হলো ইমদাদুল ফাতাওয়া। ৬ খণ্ডে সমাপ্ত এই গ্রন্থটি আধুনিক যুগের ফকীহ ও মুফতিদের জন্য একটি অমূল্য রত্নভাণ্ডার।
  • খুতবাতে হাকিমুল উম্মত: তাঁর দেওয়া শত শত গবেষণামূলক, হৃদয়গ্রাহী ও সংস্কারমুখী ভাষণের এক সুবিশাল সংকলন। এতে মানুষের দৈনন্দিন জীবনের এমন কোনো মনস্তাত্ত্বিক বা ধর্মীয় সমস্যা নেই, যার যৌক্তিক সমাধান তিনি দেননি।
  • নশরুত তীব ফী যিকরি নাবিইয়্যিল হাবীব (সা.): অত্যন্ত নিখাদ প্রেম, আবেগ ও প্রামাণ্য দলিলের ভিত্তিতে রচিত রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর একটি অনন্য ও সুপ্রসিদ্ধ সিরাত (জীবনী) গ্রন্থ।
  • আদাবুল মুয়াশারা: সামাজিক শিষ্টাচার ও পারস্পরিক অধিকার নিয়ে রচিত এই বইটি মানবিক মূল্যবোধ গঠনে একটি অনবদ্য রচনা।

## সংস্কারমূলক পদ্ধতি ও চিন্তাধারা (মানহাজ)

মাওলানা থানবী (রহ.)-এর সমাজ সংস্কারের মূলভিত্তি ছিল অত্যন্ত বিজ্ঞানসম্মত, ভারসাম্যপূর্ণ এবং শরীয়তের গণ্ডির ভেতর সীমাবদ্ধ।

১. শরীয়ত ও তরিকতের সমন্বয়: তৎকালীন সমাজে তাসাউফ বা সুফিবাদকে অনেকেই শরীয়ত থেকে আলাদা কিছু মনে করত। তিনি অত্যন্ত জোরালোভাবে প্রমাণ করেছেন যে, শরীয়তের বিধান (নামাজ, রোজা, হালাল-হারাম) পরিপূর্ণরূপে পালন করা ছাড়া কোনো আত্মশুদ্ধি বা তরিকত সম্ভব নয়। তিনি ভণ্ড পীরদের কঠোর সমালোচনা করেছেন এবং তাসাউফকে কুরআন ও সুন্নাহর ছাঁচে ঢেলে নতুন রূপ দিয়েছেন।

২. বিদআত ও কুসংস্কার উচ্ছেদ: ভারতীয় মুসলিম সমাজে তখন হিন্দুয়ানি রীতিনীতি, বিভিন্ন কুসংস্কার এবং বিদআতের ছড়াছড়ি ছিল। তিনি তাঁর লেখনী ও বক্তব্যের মাধ্যমে অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে শিরক ও বিদআতের মূলোৎপাটন করার চেষ্টা করেছেন।

৩. মনস্তাত্ত্বিক চিকিৎসা: তিনি মানুষের মনস্তত্ত্ব খুব ভালো বুঝতেন। কে কোন মানসিক ব্যাধিতে (যেমন: অহংকার, রিয়া বা প্রদর্শনচ্ছা, হিংসা, দুনিয়ার মোহ) আক্রান্ত, তা তিনি সহজে ধরতে পারতেন এবং সে অনুযায়ী তার আত্মিক চিকিৎসার ব্যবস্থা করতেন।

## ইন্তেকাল ও রেখে যাওয়া উত্তরাধিকার

উম্মাহর এই মহান আধ্যাত্মিক চিকিৎসক, শ্রেষ্ঠ ফকীহ ও দরদী অভিভাবক ১৯৪৩ সালের ২০ জুলাই (১৬ রজব, ১৩৬২ হিজরি) তাঁর জন্মস্থান থানাভবনে ইন্তেকাল করেন।

তিনি পৃথিবী থেকে বিদায় নিলেও, তাঁর প্রতিষ্ঠিত বিশাল জ্ঞানভাণ্ডার এবং তাঁর তৈরি করা অসংখ্য যোগ্য খলিফা (আধ্যাত্মিক উত্তরসূরি) রেখে গেছেন, যাঁরা পরবর্তীতে তাঁর জ্ঞান ও সংস্কারের ধারাকে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দিয়েছেন। তাঁর বিশিষ্ট খলিফাদের মধ্যে অন্যতম হলেন— মুফতি মুহাম্মাদ শফী (রহ.) (যিনি তাফসিরে ‘মা’আরিফুল কুরআন’ রচনা করেছেন), আল্লামা সাইয়েদ সুলাইমান নদভী (রহ.), মাওলানা আব্দুল মাজেদ দরিয়াবাদী (রহ.), ডা. আব্দুল হাই আরফী (রহ.) এবং মাওলানা মানযুর নুমাইনী (রহ.)।

মাওলানা আশরাফ আলী থানবী (রহ.)-এর জীবন ছিল ইলম, আমল, সুন্নাহর অনুসরণ এবং উম্মাহর প্রতি অপরিসীম দরদের এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। তাঁর অতুলনীয় সাহিত্যিক ও আত্মিক উত্তরাধিকার আজো দিকভ্রান্ত মুসলিম উম্মাহকে সঠিক পথের দিশা দিয়ে যাচ্ছে।