বিগত শতাব্দীতে মুসলিম উম্মাহ যে কয়েকজন ক্ষণজন্মা ও অতুলনীয় মেধার অধিকারী ইসলামী পণ্ডিতের দেখা পেয়েছে, শাইখ মুহাম্মাদ ইবনে সালিহ আল-উসাইমীন (রহ.) নিঃসন্দেহে তাঁদের মধ্যে অন্যতম শীর্ষস্থানীয়। কুরআন ও সুন্নাহর জটিল বিষয়গুলোকে সাধারণ মানুষের বোধগম্য করে অত্যন্ত সহজ, যৌক্তিক ও সুশৃঙ্খলভাবে উপস্থাপন করার যে ঐশী প্রতিভা তাঁর ছিল, তা সমকালীন ইতিহাসে বিরল। তিনি কেবল একজন আলেম বা মুফতিই ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন একজন আদর্শ শিক্ষক, যিনি তাঁর জ্ঞান, চরিত্র এবং প্রজ্ঞার মাধ্যমে পুরো বিশ্বে লক্ষ লক্ষ ছাত্র তৈরি করেছেন।
## জন্ম ও বংশপরিচয়
তাঁর পুরো নাম আবু আব্দুল্লাহ মুহাম্মাদ ইবনে সালিহ ইবনে মুহাম্মাদ ইবনে সুলাইমান ইবনে আব্দুর রহমান আল-উসাইমীন আত-তামিমী। তিনি ১৯২৫ খ্রিস্টাব্দে (২৭ রমজান, ১৩৪৭ হিজরি) সৌদি আরবের কাসিম প্রদেশের উনাইযা (Unayzah) নামক শহরের এক সম্ভ্রান্ত ও অত্যন্ত দ্বীনদার পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পরিবারটি ঐতিহাসিকভাবেই ইলম (জ্ঞান) এবং তাকওয়ার (খোদাভীতি) জন্য ওই অঞ্চলে সুপরিচিত ছিল। উনাইযা শহরটি তখন ছিল ইসলামী জ্ঞান-বিজ্ঞানের একটি উর্বর চারণভূমি, যা তাঁর ভবিষ্যৎ জীবনের ভিত গড়ে দিতে ব্যাপক ভূমিকা পালন করেছিল।
## শিক্ষাজীবনের সূচনা ও হিফজুল কুরআন
শাইখ আল-উসাইমীন (রহ.)-এর শিক্ষাজীবনের হাতেখড়ি হয় তাঁর নিজের পরিবারেই। ছোটবেলাতেই তিনি তাঁর পিতামহ শাইখ আব্দুর রহমান ইবনে সুলাইমানের কাছে পবিত্র কুরআন মাজীদ পড়া শুরু করেন এবং অত্যন্ত অল্প বয়সেই সম্পূর্ণ কুরআন হিফজ (মুখস্থ) সম্পন্ন করেন। এরপর তিনি উনাইযার স্থানীয় মকতবে লেখালেখি, গণিত এবং ইসলামী শিষ্টাচার সম্পর্কে প্রাথমিক জ্ঞান অর্জন করেন। ছোটবেলা থেকেই তাঁর স্মরণশক্তি এতই প্রখর ছিল যে, যেকোনো বিষয় একবার শুনলেই তা তাঁর স্মৃতিতে গেঁথে যেত।
## জ্ঞানার্জন ও প্রখ্যাত উস্তাদগণ
শাইখ উসাইমীন (রহ.) তাঁর জীবনে বহু বরেণ্য আলেমের সাহচর্য লাভ করেছেন। তবে তাঁর ইলমী ও আধ্যাত্মিক জীবন যাঁদের হাতে সবচেয়ে বেশি পূর্ণতা পেয়েছে, তাঁরা হলেন:
১. আল্লামা আব্দুর রহমান আস-সাদী (রহ.): তিনি ছিলেন শাইখ উসাইমীনের জীবনের সবচেয়ে বড় এবং প্রধান উস্তাদ। আল্লামা আস-সাদী (রহ.) ছিলেন তৎকালীন উনাইযা শহরের সবচেয়ে বড় আলেম এবং বিখ্যাত মুফাসসির (যিনি ‘তাফসিরে সাদী’ রচনা করেছেন)। শাইখ উসাইমীন অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে তাঁর উস্তাদের কাছে দীর্ঘকাল অবস্থান করেন এবং তাফসির, হাদিস, ফিকহ, উসুলুল ফিকহ, আরবি ব্যাকরণ ও আকিদা অধ্যয়ন করেন। আস-সাদীর অনন্য বৈশিষ্ট্য ছিল স্বাধীনভাবে গবেষণা করা এবং অন্ধ অনুকরণ না করা—এই গুণটি শাইখ উসাইমীন (রহ.) তাঁর উস্তাদের কাছ থেকেই পুরোপুরি আয়ত্ত করেছিলেন। ১৯৫৬ সালে (১৩৭৬ হিজরি) আল্লামা আস-সাদীর ইন্তেকাল পর্যন্ত শাইখ উসাইমীন ছায়ার মতো তাঁর সাথে ছিলেন।
২. শাইখ আব্দুল আযীয ইবনে বায (রহ.): ১৯৫২ সালে যখন রিয়াদে ‘সায়েন্টিফিক ইন্সটিটিউট’ চালু হয়, শাইখ উসাইমীন সেখানে ভর্তি হন এবং তৎকালীন শ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস ও ফকীহ শাইখ আব্দুল আযীয ইবনে বায (রহ.)-এর সরাসরি সান্নিধ্য লাভ করেন। তিনি ইবনে বায (রহ.)-এর কাছে সহীহ বুখারী, শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রহ.)-এর কিতাব এবং ফিকহের অত্যন্ত জটিল বিষয়গুলো অধ্যয়ন করেন। ইবনে বায (রহ.) তাঁর এই মেধাবী ছাত্রকে অত্যন্ত স্নেহ করতেন।
৩. শাইখ মুহাম্মাদ আল-আমিন আশ-শানকীতী (রহ.): এই বিশ্ববিখ্যাত মুফাসসির ও উসূলবিদের কাছেও শাইখ উসাইমীন গভীর ইলম হাসিল করেন, যা তাঁর চিন্তাধারাকে আরও সুতীক্ষ্ণ করেছিল।
## কর্মজীবন ও দায়িত্বভার
প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনা শেষ করে তিনি কর্মজীবনে প্রবেশ করেন এবং উম্মাহর খেদমতে নিজেকে সম্পূর্ণ নিয়োজিত করেন।
- উনাইযার গ্র্যান্ড মসজিদের ইমামতি: তাঁর প্রিয় উস্তাদ আল্লামা আস-সাদীর ইন্তেকালের পর, উনাইযা শহরের জামে মসজিদের ইমাম ও খতিবের গুরুদায়িত্ব শাইখ উসাইমীনের ওপর অর্পণ করা হয়। তিনি আমৃত্যু প্রায় অর্ধ শতাব্দী ধরে এই দায়িত্ব পালন করেন।
- বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা: তিনি রিয়াদের ইমাম মুহাম্মাদ ইবনে সৌদ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের কাসিম শাখা (শরিয়া অনুষদ)-এর অধ্যাপক হিসেবে নিযুক্ত হন এবং দীর্ঘকাল শিক্ষকতা করেন।
- উচ্চতর উলামা পরিষদের সদস্য: ১৯৮৭ সালে তাঁকে সৌদি আরবের সর্বোচ্চ ধর্মীয় ফোরাম ‘কাউন্সিল অব সিনিয়র স্কলার্স’ (হাইআতু কিবারিল উলামা)-এর সম্মানিত সদস্য মনোনীত করা হয়।
এত বড় বড় পদ এবং রাষ্ট্রীয় সম্মান পাওয়া সত্ত্বেও তিনি কখনো তাঁর জন্মস্থান উনাইযা শহর ছেড়ে রাজধানী রিয়াদে বিলাসবহুল জীবনযাপন করতে যাননি। তিনি তাঁর সাধারণ মাটির ঘরে থেকেই সারা বিশ্বকে ইলমের আলো বিলিয়েছেন।
## শিক্ষাদান পদ্ধতি (মানহাজ) ও অনন্য বৈশিষ্ট্য
শাইখ আল-উসাইমীন (রহ.)-এর সবচেয়ে বড় পরিচয় হলো, তিনি ছিলেন আধুনিক যুগের একজন শ্রেষ্ঠ ও সফল মুয়াল্লিম (শিক্ষক)। তাঁর শিক্ষাদান পদ্ধতি (Teaching Methodology) এতই বৈজ্ঞানিক ও মনস্তাত্ত্বিক ছিল যে, সারা বিশ্বের শিক্ষাবিদদের কাছে তা আজও বিস্ময়।
- সহজবোধ্য ও কাঠামোবদ্ধ উপস্থাপন: তিনি যেকোনো জটিল ফিকহী মাসআলাকে পয়েন্ট আকারে, অত্যন্ত চমৎকার শ্রেণিবিভাগের মাধ্যমে (Categorization) ছাত্রদের সামনে তুলে ধরতেন। ফলে সবচেয়ে কঠিন বিষয়গুলোও সাধারণ ছাত্রদের কাছে পানির মতো পরিষ্কার হয়ে যেত।
- ছাত্রদের সাথে মতবিনিময়: গতানুগতিক লেকচারের বদলে তিনি ছাত্রদের প্রশ্ন করতেন, তাদের চিন্তাশক্তি বৃদ্ধিতে সহায়তা করতেন এবং ক্লাসে অত্যন্ত প্রাণবন্ত একটি পরিবেশ বজায় রাখতেন।
- অন্ধ অনুকরণের বিরোধিতা ও দলিলের প্রাধান্য: ফিকহের ক্ষেত্রে তিনি মূলত হাম্বলী মাজহাবের কিতাব পড়াতেন, কিন্তু তিনি অন্ধ তাকলীদকে কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। কোনো মাসআলায় যদি হাম্বলী মাজহাবের মতের চেয়ে অন্য মাজহাব বা ইমামের মত কুরআন ও সহীহ সুন্নাহর বেশি কাছাকাছি হতো, তিনি বিনা দ্বিধায় দলিলের ভিত্তিতে সেই রায়কে অগ্রাধিকার দিতেন।
তাঁর আরেকটি যুগান্তকারী কাজ হলো প্রযুক্তিকে কাজে লাগানো। তাঁর সমস্ত ক্লাস, খুতবা ও ফতোয়া অডিও ক্যাসেটে রেকর্ড করা হতো। এই রেকর্ডিংগুলো পরবর্তীতে বই আকারে রূপান্তরিত হয়, যা বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষের কাছে ইলম পৌঁছে দিয়েছে।
## চারিত্রিক মাধুর্য, বিনয় ও দুনিয়াবিমুখতা (যুহদ)
জ্ঞানের পাহাড় হওয়া সত্ত্বেও শাইখ আল-উসাইমীন (রহ.) ছিলেন অত্যন্ত বিনয়ী এবং দুনিয়াবিমুখ (যাহিদ) একজন মানুষ। তিনি অত্যন্ত সাধারণ ও জীর্ণ পোশাক পরতেন। তৎকালীন সৌদি বাদশা খালিদ বিন আব্দুল আযীয একবার উনাইজায় এসে শাইখের মাটির তৈরি পুরোনো ও জরাজীর্ণ বাড়িটি দেখে তাঁকে একটি নতুন এবং বিশাল ভিলা (রাজপ্রাসাদ সমতুল্য বাড়ি) উপহার দেওয়ার প্রস্তাব দেন। কিন্তু বিনয়ী শাইখ তা অত্যন্ত ভদ্রতার সাথে ফিরিয়ে দিয়ে বলেন, “আমার এই বাড়িটি মসজিদের খুব কাছে, যা আমার জন্য যথেষ্ট। আমার নতুন বাড়ির দরকার নেই।”
তিনি সাধারণ মানুষের সাথে অত্যন্ত সহজে মিশতে পারতেন। তাঁর কাছে ফতোয়া বা পরামর্শের জন্য যাওয়ার ক্ষেত্রে কোনো প্রটোকলের প্রয়োজন হতো না। এমনকি তিনি নিজের নামের শুরুতে ‘শাইখ’ বা ‘আল্লামা’ পদবি ব্যবহার করতেও ভীষণ অপছন্দ করতেন।
## অবিস্মরণীয় রচনাবলি ও সাহিত্যিক অবদান
শাইখ আল-উসাইমীন (রহ.) সরাসরি যে বইগুলো লিখেছেন এবং তাঁর অডিও লেকচার থেকে পরবর্তীতে যে বইগুলো সংকলিত হয়েছে, তার সংখ্যা শতাধিক। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলো:
- আশ-শারহুল মুমতি আলা যাদিল মুসতাকনি: এটি তাঁর জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কীর্তি (মাস্টারপিস)। এটি হাম্বলী ফিকহের অত্যন্ত জনপ্রিয় গ্রন্থ ‘যাদুল মুসতাকনি’-এর ১৫ খণ্ডের বিশাল ও আধুনিক ব্যাখ্যাগ্রন্থ। সমকালীন ফিকহী গ্রন্থগুলোর মধ্যে এর তুলনাই হয় না।
- ফাতাওয়া আরকানুল ইসলাম: সাধারণ মুসলিমদের দৈনন্দিন জীবনের জন্য অত্যন্ত জরুরি একটি বই। এতে ইসলাম, ঈমান, নামাজ, রোজা, হজ ও জাকাত বিষয়ে মানুষের জিজ্ঞাসিত শত শত প্রশ্নের কুরআন-সুন্নাহ ভিত্তিক যৌক্তিক উত্তর দেওয়া হয়েছে।
- আল-কাওয়াইদুল মুসলা: আল্লাহর সুন্দর নাম ও সুমহান গুণাবলির ওপর ইসলামী আকিদার একটি অসামান্য ও ভারসাম্যপূর্ণ বই।
- তাফসিরে উসাইমীন: তিনি পবিত্র কুরআনের বহু সূরার অত্যন্ত চমৎকার, সাবলীল ও শিক্ষণীয় তাফসির করেছেন, যা একাধিক খণ্ডে প্রকাশিত হয়েছে।
- শারহু রিয়াদুস সালিহীন: ইমাম নববীর বিশ্ববিখ্যাত হাদিস গ্রন্থ রিয়াদুস সালিহীনের অত্যন্ত হৃদয়গ্রাহী ও বাস্তবসম্মত একটি ব্যাখ্যাগ্রন্থ।
- শারহুল আকিদাতিল ওয়াসিতিয়্যাহ: শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ রচিত আকিদার মূল ভিত্তির ওপর এক অনন্য ব্যাখ্যাগ্রন্থ।
## অসুস্থতা, ইন্তেকাল ও জানাযা
জীবনের শেষভাগে শাইখ আল-উসাইমীন (রহ.) ক্যান্সারে আক্রান্ত হন। চিকিৎসা চলাকালীন আমেরিকায় অবস্থানকালেও তিনি তাঁর ফতোয়া প্রদান এবং দ্বীনি কাজ বন্ধ রাখেননি। শারীরিক প্রচণ্ড দুর্বলতা ও অসুস্থতা নিয়েও তিনি জীবনের শেষ রমজান মাসে পবিত্র মক্কায় মসজিদুল হারামে হুইলচেয়ারে বসে প্রতিদিন অসংখ্য ছাত্রকে পাঠদান করতেন।
অবশেষে এই মহান মনীষী ২০০১ সালের ১১ জানুয়ারি (১৫ শাওয়াল, ১৪২১ হিজরি) রোজ বৃহস্পতিবার বিকেলে জেদ্দায় ইন্তেকাল করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল প্রায় ৭৪ বছর।
পরদিন শুক্রবার মসজিদুল হারামে জুমার নামাজের পর তাঁর জানাযা অনুষ্ঠিত হয়। সেদিনের জানাযায় প্রায় পাঁচ লক্ষাধিক মানুষ অংশ নিয়েছিল, যাদের কান্নায় পুরো হারাম শরিফ ভারী হয়ে উঠেছিল। তাঁকে মক্কার পবিত্র ‘আল-আদল’ কবরস্থানে তাঁরই একসময়ের শিক্ষক ও বন্ধু শাইখ ইবনে বায (রহ.)-এর কবরের পাশেই সমাহিত করা হয়।
শাইখ মুহাম্মাদ ইবনে সালিহ আল-উসাইমীন (রহ.) আজ সশরীরে আমাদের মাঝে নেই। কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া অতুলনীয় জ্ঞানভাণ্ডার, তাঁর লক্ষ লক্ষ অডিও লেকচার এবং তাঁর রচিত গ্রন্থাবলি কিয়ামত পর্যন্ত সারা বিশ্বের মুসলিমদের জন্য হিদায়াতের এক উজ্জ্বল বাতিঘর হয়ে থাকবে। ইসলামী জ্ঞান-বিজ্ঞানে আধুনিক যুগের এই মুজাদ্দিদ ও ফকীহের নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।