ইসলামী ইতিহাসের আকাশ থেকে যে কয়জন ক্ষণজন্মা নক্ষত্র তাঁদের অসীম বীরত্ব, নিখুঁত ন্যায়বিচার, অতুলনীয় মহানুভবতা এবং বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার মাধ্যমে কেবল মুসলিম বিশ্বেই নয়, বরং পশ্চিমা ইতিহাসেও অমর হয়ে আছেন, সুলতান সালাহউদ্দীন আইয়ুবী (রহ.) তাঁদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ। শত বছর ধরে ক্রুসেডারদের বর্বরোচিত দখলদারিত্ব থেকে পবিত্র বায়তুল মুকাদ্দাস (জেরুজালেম) মুক্ত করার মাধ্যমে তিনি যেমন সামরিক শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ দিয়েছেন, তেমনি একটি ছিন্নভিন্ন মুসলিম উম্মাহকে ঐক্যবদ্ধ করে এক সুশৃঙ্খল ও শক্তিশালী সাম্রাজ্য গঠন করার ক্ষেত্রে তাঁর রাজনৈতিক প্রজ্ঞাও ছিল সমকালীন ইতিহাসের এক বিস্ময়।
## জন্ম, বংশপরিচয় এবং রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
সুলতান সালাহউদ্দীন আইয়ুবীর প্রকৃত নাম ছিল ইউসুফ। তাঁর উপাধি ছিল ‘সালাহউদ্দীন’ (দ্বীনের কল্যাণ) এবং তাঁর পিতার নাম ছিল নাজমুদ্দীন আইয়ুব। তিনি ১১৩৭ খ্রিস্টাব্দে (৫৩২ হিজরি) মেসোপটেমিয়ার (বর্তমান ইরাক) দজলা নদীর তীরবর্তী তিকরিত দুর্গে এক সম্ভ্রান্ত কুর্দি মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পরিবারটি মূলত রাওয়াদিয়া নামক কুর্দি উপজাতির একটি শাখা ছিল।
সালাহউদ্দীনের জন্মের রাতেই তাঁর পিতা নাজমুদ্দীন আইয়ুব রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের কারণে তিকরিতের শাসনভার ত্যাগ করে সপরিবারে সিরিয়ার আলেপ্পোর উদ্দেশ্যে হিজরত করেন। সেই সময় মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত টালমাটাল। একদিকে আব্বাসীয় খিলাফত দুর্বল হয়ে পড়েছিল, অন্যদিকে সেলজুক সাম্রাজ্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আমিরাতে বিভক্ত হয়ে নিজেদের মধ্যে লড়াইয়ে লিপ্ত ছিল। এই দুর্বলতার সুযোগেই ১০৯৯ খ্রিস্টাব্দে ইউরোপীয় ক্রুসেডাররা প্রথম ক্রুসেডের মাধ্যমে জেরুজালেম দখল করে নিয়েছিল। সালাহউদ্দীনের বাল্যকাল কাটে সিরিয়ার প্রখ্যাত শাসক এবং ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে প্রথম সফল প্রতিরোধ গড়ে তোলা বীর সেনাপতি ইমাদউদ্দীন জঙ্গী এবং তাঁর সুযোগ্য পুত্র নূরউদ্দীন জঙ্গী (রহ.)-এর শাসনাধীনে।
## প্রাথমিক শিক্ষা, চরিত্র গঠন এবং সাহিত্যের প্রতি অনুরাগ
সালাহউদ্দীন আইয়ুবী (রহ.) কেবল একজন সামরিক প্রতিভাই ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন অত্যন্ত সুশিক্ষিত এবং সাহিত্যের প্রতি গভীর অনুরাগী একজন ব্যক্তিত্ব। দামেস্কের অত্যন্ত উন্নত ও বুদ্ধিবৃত্তিক পরিবেশে তাঁর বেড়ে ওঠা। যৌবনে তিনি সামরিক বিদ্যার চেয়ে ইসলামী ধর্মতত্ত্ব, দর্শন, গণিত এবং সাহিত্যের প্রতি বেশি আকৃষ্ট ছিলেন। তিনি পবিত্র কুরআন মুখস্থ করেছিলেন এবং হাদিস শাস্ত্র, ফিকহ ও আরবি ব্যাকরণে গভীর জ্ঞান অর্জন করেছিলেন।
তাঁর অন্যতম প্রিয় বিষয় ছিল আরবি কবিতা এবং ইতিহাস। প্রখ্যাত আরব কবিদের দিওয়ান (কবিতা সমগ্র) তাঁর মুখস্থ ছিল। তিনি বিশ্বাস করতেন যে, একটি শক্তিশালী জাতি গঠন করতে হলে তলোয়ারের পাশাপাশি কলম এবং বুদ্ধিবৃত্তিক জাগরণ অপরিহার্য। পরবর্তী জীবনে তিনি যখন বিশাল সাম্রাজ্যের অধিপতি হন, তখনও তাঁর দরবার সবসময় প্রখ্যাত আলেম, ইতিহাসবিদ, কবি এবং চিকিৎসকদের পদচারণায় মুখর থাকত।
## মিসরের শাসনভার গ্রহণ ও ফাতিমীয় খিলাফতের অবসান
যৌবনে সালাহউদ্দীন তাঁর আপন চাচা এবং নূরউদ্দীন জঙ্গীর বিশ্বস্ত প্রধান সেনাপতি আসাদউদ্দীন শিরকুহের সাথে মিসর অভিযানে অংশগ্রহণ করেন। ফাতিমীয় খিলাফতের অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং ক্রুসেডারদের মিসর দখলের পাঁয়তারা রুখে দিতে এই সামরিক অভিযানগুলো পরিচালিত হয়। ১১৬৯ খ্রিস্টাব্দে আসাদউদ্দীন শিরকুহের আকস্মিক মৃত্যুর পর, মাত্র ৩২ বছর বয়সে সালাহউদ্দীন মিসরের উজির (প্রধানমন্ত্রী) হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
মিসরের উজির হওয়ার পর তাঁকে ফাতিমীয় রাজপ্রাসাদের বহু ষড়যন্ত্র এবং বিদ্রোহের সম্মুখীন হতে হয়। কিন্তু তিনি অত্যন্ত প্রজ্ঞা ও অসীম সাহসিকতার সাথে সমস্ত বিদ্রোহ দমন করেন। ১১৭১ খ্রিস্টাব্দে ফাতিমীয় খলিফা আল-আদিদের মৃত্যুর পর তিনি দীর্ঘ আড়াই শতাব্দী ধরে চলা শিয়া ফাতিমীয় খেলাফতের অবসান ঘটান এবং মিসরে আব্বাসীয় খিলাফতের আনুগত্য ও সুন্নি মতাদর্শ পুনর্প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি মিসরের বিশ্ববিখ্যাত ‘আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়’-কে শিয়া মতবাদের প্রচারকেন্দ্র থেকে সুন্নি ইসলামী জ্ঞান-বিজ্ঞানের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠে রূপান্তরিত করেন।
## মুসলিম বিশ্বের ঐক্য সাধন এবং হাশাশিনদের দমন
১১৪৭ খ্রিস্টাব্দে নূরউদ্দীন জঙ্গীর মৃত্যুর পর সিরিয়া এবং মেসোপটেমিয়ায় ক্ষমতার চরম শূন্যতা দেখা দেয়। ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে একটি চূড়ান্ত লড়াইয়ের জন্য মুসলিম বিশ্বের ঐক্য ছিল অপরিহার্য। সালাহউদ্দীন আইয়ুবী বুঝতে পেরেছিলেন যে, বিভক্ত মুসলিম বিশ্ব নিয়ে জেরুজালেম জয় করা অসম্ভব। তাই তিনি মিসর, সিরিয়া, ইয়েমেন, মেসোপটেমিয়া এবং হিজাজ (মক্কা-মদিনা) নিয়ে একটি বিশাল ও ঐক্যবদ্ধ ইসলামী সাম্রাজ্য গড়ে তোলেন, যা ইতিহাসে ‘আইয়ুবী রাজবংশ’ নামে পরিচিত।
এই ঐক্য সাধনের পথে তাঁকে বহু মুসলিম শাসকের সাথেও লড়াই করতে হয়েছিল। বিশেষ করে ‘হাশাশিন’ (Assassins) নামক একটি দুর্ধর্ষ গুপ্তঘাতক দলের সাথে তাঁকে দীর্ঘ সংগ্রাম করতে হয়। তারা বেশ কয়েকবার সালাহউদ্দীনকে হত্যার চেষ্টা করে। শেষ পর্যন্ত তিনি সিরিয়ার আন-নুসায়রিয়া পর্বতমালার দুর্গম অঞ্চলে হাশাশিনদের শক্তিশালী দুর্গগুলো অবরোধ করেন এবং তাদের সম্পূর্ণভাবে নিষ্ক্রিয় করতে সক্ষম হন।
## বুদ্ধিবৃত্তিক জাগরণ ও সাহিত্যিক উত্তরাধিকার
সালাহউদ্দীন আইয়ুবী (রহ.)-এর জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ দিক হলো তাঁর বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাহিত্যিক উত্তরাধিকার, যা আধুনিক যুগের যেকোনো সুশৃঙ্খল শিক্ষাব্যবস্থা ও গবেষণা কাঠামোর জন্য এক অনন্য দৃষ্টান্ত।
- কাজী আল-ফাদিল ও ইমাদউদ্দীন আল-ইসফাহানি: সুলতানের প্রধান উজির ও ব্যক্তিগত সচিব ছিলেন তৎকালীন আরবের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক ও লেখক কাজী আল-ফাদিল। সুলতান বলতেন, “আমি তরবারির জোরে দেশ জয় করিনি, বরং দেশ জয় করেছি কাজী আল-ফাদিলের কলমের জোরে।” এছাড়া ইমাদউদ্দীন আল-ইসফাহানির মতো শ্রেষ্ঠ ঐতিহাসিক ও লিপিকাররা তাঁর দরবার অলংকৃত করতেন, যাঁরা সুলতানের প্রতিটি নির্দেশ ও ইতিহাস অত্যন্ত গুছিয়ে লিপিবদ্ধ করতেন।
- বাহাউদ্দীন ইবনে শাদ্দাদ: তিনি ছিলেন সালাহউদ্দীনের ব্যক্তিগত জীবনীকার ও ঘনিষ্ঠ বন্ধু। তিনি তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘আন-নাওয়াদির আস-সুলতানিয়া ওয়াল-মাহাসিন আল-ইউসুফিয়া’ নামক গ্রন্থে সুলতানের জীবনের অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও প্রামাণ্য বিবরণ লিপিবদ্ধ করে গেছেন, যা আজো ঐতিহাসিক গবেষণার অন্যতম প্রধান উৎস।
- মাদরাসা ও চিকিৎসালয় (বিমারিস্তান) প্রতিষ্ঠা: তিনি মিশর, সিরিয়া এবং জেরুজালেমে অসংখ্য মাদরাসা, খানকা এবং লাইব্রেরি স্থাপন করেন। কায়রোতে তিনি একটি বিশাল ‘বিমারিস্তান’ (হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজ) প্রতিষ্ঠা করেন, যেখানে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলের বিনামূল্যে চিকিৎসা এবং চিকিৎসাবিজ্ঞানের ওপর গবেষণার ব্যবস্থা ছিল।
## ঐতিহাসিক হিত্তিনের যুদ্ধ: ক্রুসেডারদের চূড়ান্ত পতন (১১৮৭ খ্রিস্টাব্দ)
বায়তুল মুকাদ্দাস পুনরুদ্ধারের চূড়ান্ত অধ্যায় শুরু হয় ঐতিহাসিক ‘হিত্তিনের যুদ্ধ’-এর মাধ্যমে। ক্রুসেডার শাসক রেনাল্ড অফ চ্যাটিলন (Reynald of Châtillon) বারবার শান্তিচুক্তি লঙ্ঘন করে মুসলিম বাণিজ্য কাফেলা এবং হজ যাত্রীদের ওপর বর্বরোচিত হামলা চালালে এবং পবিত্র মদিনা আক্রমণের হুমকি দিলে সালাহউদ্দীন আইয়ুবী ক্রুসেডারদের চূড়ান্ত শিক্ষা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
১১৮৭ সালের ৪ জুলাই (৫৮৩ হিজরি) গ্যালিলি সাগরের অদূরে ‘হর্নস অফ হিত্তিন’ (হিত্তিনের শিং) নামক স্থানে এক ভয়াবহ ও প্রলয়ংকরী যুদ্ধ সংঘটিত হয়। জুলাই মাসের প্রচণ্ড গরমে সালাহউদ্দীন আইয়ুবী তাঁর অসাধারণ সমরকৌশল প্রয়োগ করে ক্রুসেডার বাহিনীকে পানির উৎস থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে দেন এবং তাদের শিবিরের চারপাশের শুকনো ঘাসে আগুন লাগিয়ে দেন। তৃষ্ণা ও ধোঁয়ায় বিপর্যস্ত ক্রুসেডারদের বিশাল বাহিনী শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়। এই যুদ্ধে জেরুজালেমের রাজা গাই অফ লুসিগনান (Guy of Lusignan) এবং চুক্তি ভঙ্গকারী রেনাল্ড অফ চ্যাটিলনসহ বহু শীর্ষ ক্রুসেডার নেতা বন্দী হন। হিত্তিনের এই ঐতিহাসিক বিজয় ক্রুসেডারদের মেরুদণ্ড ভেঙে দেয় এবং জেরুজালেম পুনরুদ্ধারের পথকে সম্পূর্ণ উন্মুক্ত করে।
## পবিত্র বায়তুল মুকাদ্দাস (জেরুজালেম) পুনরুদ্ধার: এক রক্তপাতহীন বিজয়
হিত্তিনের বিজয়ের পর সালাহউদ্দীন একের পর এক ক্রুসেডার দুর্গ জয় করতে থাকেন এবং অবশেষে জেরুজালেম অবরোধ করেন। শহরের প্রতিরক্ষার দায়িত্বে ছিলেন ব্যালিয়ান অফ ইবেলিন (Balian of Ibelin)। যখন ক্রুসেডাররা বুঝতে পারল যে পতন নিশ্চিত, তখন ব্যালিয়ান হুমকি দেন যে, মুসলিমরা যদি শহরের খ্রিষ্টানদের নিরাপত্তা না দেয়, তবে তারা শহরের সমস্ত পবিত্র স্থান (এমনকি ডোম অফ দ্য রক বা কুব্বাতুস সাখরা) ধ্বংস করে দেবে এবং মুসলিম বন্দীদের হত্যা করবে।
দীর্ঘ আলোচনার পর ১১৮৭ সালের ২ অক্টোবর (২৭ রজব, পবিত্র শবে মেরাজের দিন) সুলতান সালাহউদ্দীন আইয়ুবী বিজয়ী বেশে জেরুজালেমে প্রবেশ করেন। দীর্ঘ ৮৮ বছর পর পবিত্র আল-আকসা মসজিদে পুনরায় আজানের ধ্বনি উচ্চারিত হয়।
এই বিজয়ের সবচেয়ে উজ্জ্বল দিকটি ছিল সালাহউদ্দীনের অতুলনীয় মহানুভবতা ও ক্ষমা। ১০৯৯ খ্রিস্টাব্দে ক্রুসেডাররা যখন জেরুজালেম দখল করেছিল, তখন তারা মসজিদের ভেতরে আশ্রয় নেওয়া হাজার হাজার মুসলিম নারী, পুরুষ ও শিশুকে নির্মমভাবে হত্যা করে শহরের রাস্তা রক্তে ভাসিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু সালাহউদ্দীন আইয়ুবী শহরের কোনো খ্রিষ্টান অধিবাসীর ওপর বিন্দুমাত্র প্রতিশোধ নেননি। তিনি তাদের পূর্ণ নিরাপত্তা প্রদান করেন, তাদের ধর্মীয় উপাসনালয়গুলো অক্ষত রাখেন এবং সামান্য মুক্তিপণের বিনিময়ে তাদের নিরাপদে শহর ছেড়ে যাওয়ার সুযোগ দেন। যারা মুক্তিপণ দিতে অক্ষম ছিল, সুলতান ও তাঁর ভাই আল-আদিল নিজস্ব তহবিল থেকে তাদের মুক্তিপণ পরিশোধ করে বিশ্ব ইতিহাসে এক অনন্য মানবিকতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন।
## তৃতীয় ক্রুসেড এবং রিচার্ড দ্য লায়নহার্টের সাথে সন্ধি
জেরুজালেমের পতনের খবর ইউরোপে পৌঁছালে সেখানে তীব্র প্রতিক্রিয়া ও শোকের সৃষ্টি হয়। পোপ অষ্টম গ্রেগরির আহ্বানে ইংল্যান্ডের রাজা রিচার্ড দ্য লায়নহার্ট (Richard the Lionheart), ফ্রান্সের রাজা ফিলিপ অগাস্টাস এবং জার্মান সম্রাট ফ্রেডরিক বারবারোসার নেতৃত্বে ইউরোপের সর্ববৃহৎ সম্মিলিত বাহিনী ‘তৃতীয় ক্রুসেড’ শুরু করে।
১১৯১ খ্রিস্টাব্দে রিচার্ড এক দীর্ঘ অবরোধের পর ‘অ্যাকর’ (Acre) শহর দখল করেন এবং সেখানে প্রায় তিন হাজার মুসলিম বন্দীকে নির্মমভাবে হত্যা করেন। এরপর রিচার্ড এবং সালাহউদ্দীনের মধ্যে আরসুফের যুদ্ধসহ বেশ কয়েকটি তীব্র লড়াই চলতে থাকে। তবে যুদ্ধের ময়দানেও উভয়ের মধ্যে পারস্পরিক সম্মান ও বীরত্বের এক অনন্য ইতিহাস রচিত হয়। যুদ্ধে রিচার্ডের ঘোড়া মারা গেলে সালাহউদ্দীন তাঁকে দুটি তেজস্বী ঘোড়া উপহার পাঠান। রিচার্ড অসুস্থ হলে সুলতান নিজের ব্যক্তিগত চিকিৎসক এবং বরফ ও তাজা ফলমূল পাঠান।
শেষ পর্যন্ত রিচার্ড বুঝতে পারেন যে সালাহউদ্দীনকে সম্পূর্ণ পরাজিত করে জেরুজালেম দখল করা অসম্ভব। ১১৯২ সালের ২ সেপ্টেম্বর রিচার্ড ও সালাহউদ্দীনের মধ্যে ঐতিহাসিক ‘জাফার চুক্তি’ (Treaty of Jaffa) স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তি অনুযায়ী জেরুজালেম মুসলিমদের নিয়ন্ত্রণেই থাকে, তবে খ্রিষ্টান তীর্থযাত্রীদের সেখানে নিরাপদে এবং অস্ত্রবিহীন অবস্থায় যাতায়াতের অধিকার দেওয়া হয়।
## ইন্তেকাল এবং অসামান্য উত্তরাধিকার
তৃতীয় ক্রুসেডের অবসানের পর সুলতান সালাহউদ্দীন আইয়ুবী ক্লান্ত শরীরে দামেস্কে ফিরে আসেন। অবিরাম যুদ্ধ, রাতজাগা, সাম্রাজ্য পরিচালনার ভার এবং শারীরিক অসুস্থতায় তিনি অত্যন্ত দুর্বল হয়ে পড়েছিলেন। ১১৯৩ সালের ৪ মার্চ (২৭ সফর, ৫৮৯ হিজরি) মাত্র ৫৬ বছর বয়সে এই মহান শাসক দামেস্কে ইন্তেকাল করেন।
মৃত্যুকালে তাঁর ব্যক্তিগত কোষাগারে মাত্র একটি স্বর্ণমুদ্রা এবং ৪৭টি রৌপ্যমুদ্রা অবশিষ্ট ছিল। সুবিশাল এক সাম্রাজ্যের অধিপতি এবং অঢেল সম্পদের মালিক হওয়া সত্ত্বেও নিজের কাফন-দাফন বা জানাযার জন্য পর্যাপ্ত অর্থ তিনি রেখে যাননি। তাঁর সমস্ত সম্পদ তিনি রাষ্ট্র, জনকল্যাণ এবং যুদ্ধের ময়দানে ব্যয় করেছিলেন। দামেস্কের উমাইয়া মসজিদের পাশেই তাঁকে অত্যন্ত অনাড়ম্বরভাবে সমাহিত করা হয়।
সুলতান সালাহউদ্দীন আইয়ুবী (রহ.) কেবল তলোয়ারের শক্তিতে নয়, বরং তাঁর নিখুঁত চরিত্র, ন্যায়বিচার, প্রতিশ্রুতি রক্ষা এবং জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রতি ভালোবাসার মাধ্যমে বিশ্ব ইতিহাসে এক অমর অধ্যায় রচনা করে গেছেন। তাঁর রেখে যাওয়া সাহিত্যিক, রাজনৈতিক ও সামরিক উত্তরাধিকার আজো বিশ্বব্যাপী ইতিহাসবিদ, সামরিক বিশ্লেষক এবং গবেষকদের কাছে এক বিস্ময়কর গবেষণার বিষয়।